ঢাকা, শুক্রবার, ২৭শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবায় যুগান্তকারী অর্জন ও সাফল্যে বিএসএমএমইউ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রেন ডেথ রোগীর অঙ্গদানের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম সফল ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট সম্পন্ন হয়েছে। এক রোগীর অঙ্গদানের মাধ্যমে দুটি কিডনি দুজন কিডনি বিকল রোগীর দেহে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এবং একই সঙ্গে ওই রোগীর দুটি কর্ণিয়াও অন্য দু’জন রোগীর চোখে সফলভাবে প্রতিস্থান করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়েরর সাফল্যের তালিকায় আরেকটি মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রথম অঙ্গদাতা হিসেবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইতিহাস সৃষ্টি করলো ২০ বছর বয়সী সারা ইসলাম। বাংলাদেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে সারা ইসলামের নাম। তাঁর এই মহৎ আত্মত্যাগের মহিমা চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভাস্মর হয়ে থাকবে। এর মাধ্যমে সবার মাঝে সচেতনতা তৈরি হবে এবং যাদের প্রয়োজন এমন সব রোগী অঙ্গগ্রহণের মাধ্যমে নতুন জীবন পাবে। আজ বৃহস্পতিবার ১৯ জানুয়ারি ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মিল্টন হলে বিকাল ৩টায় আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মাননীয় উপাচার্য ও জাতীয় ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোঃ শারফুদ্দিন আহমেদ। প্রকৃতপক্ষে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোঃ শারফুদ্দিন আহমেদ এর সার্বিক নির্দেশনায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, রেনাল ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন, ইউরোলোজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোঃ হাবিবুর রহমান দুলালের নেতৃত্বে এবং এ্যানেসথেসিয়া, এনালজেসিয়া এবং ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সার্বিক সহযোগীতায় বাংলাদেশে প্রথম সফল ক্যাডাভেরিক বা ব্রেন ডেথ রোগীর অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। গতকাল ১৮ জানুয়ারী ২০২৩ইং তারিখে সারা রাত ধরে ঐতিহাসিক এই মহতী কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোঃ শারফুদ্দিন আহমেদ, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. ছয়েফ উদ্দিন আহমদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, প্রক্টর ও ইউরোলোজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোঃ হাবিবুর রহমান দুলাল, কিডনী ফাউন্ডেশনের পথিকৃৎ অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ, ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রথম অঙ্গদাতা সারা ইসলামের মা শিক্ষিকা শবনম সুলতানা প্রমুখসহ ইরোলজি বিভাগ, চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগ ও কমিউনিটি অফথালমোলজি বিভাগের চিকিৎসক, চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বুধবার (১৮ জানুয়ারি,২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ) দিবাগত রাত সাড়ে দশটায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবিন ব্লকে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট অপারেশন থিয়েটারে এ রোগীর অপারেশন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান দুলালের নেতৃত্বাধীন একটি চিকিৎসক দল। এ্যানেসথেসিয়া বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. দেবাশীষ বণিক ও অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিকের নেতৃত্বে সিনিয়র এনেসথেসিওলজিস্টগণ অপারেশন পরিচালনা করেন। জটিল এই অপারেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ভোর সাড়ে চারটার দিকে। এই মহতী উদ্যোগে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোঃ সাইফুল হোসেন দিপু, সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারুক হোসেন, সহকারী অধ্যাপক ডা. কার্তিক চন্দ্র ঘোষ, এ্যানেসথেসিয়া এ্যানালজেসিয়া এন্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. দেবাশিষ বনিক, অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বনিক, সহযোগী অধ্যাপক ডা. দিলীপ ভৌমিক, সহকারী অধ্যাপক ডা. মো: আশরাফুজ্জামান সজিব, সহকারী অধ্যাপক ডা. মোঃ আব্দুল হান্নান, কনসালট্যান্ট ডা. মোমিনুল হক, সিনিয়র রেসিডেন্টবৃন্দ, মেডিক্যাল অফিসারবৃন্দ। এসময় নেফ্রোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম এবং সহকারী অধ্যাপক ডা. মানিক মন্ডল উপস্থিত ছিলেন। সারা ইসলামের দুটি কিডনির একটি মিরপুরের বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী শামীমা আক্তারের দেহে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিডনি অপারেশন থিয়েটারে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে অপর কিডনিটি কিডনি ফাউন্ডেশনে অপর এক রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়। কিডনি ও কর্নিয়া দানকারী সারা ইসলামের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার চিকিৎসার সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক ডা. কামরুল হুদা । এসময় রোগ নির্ণয় ও পরবর্তীতে অঙ্গদানের মহৎ উদ্যোগে সারার মা, স্কুল শিক্ষিকা শবনম সুলতানাকে উদ্বুদ্ধ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউ’র সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুজ্জামান সজীব, যিনি ক্যাডাভেরিক সেলর সদস্য। পরর্বর্তীতে ডা. সজিব ট্রান্সপ্ল্যান্ট মেডিক্যাল টিমকে অবহিত করেন এবং পুরো প্রক্রিয়া শুরু হয়। শিক্ষিকা মাতা শবনম সুলতানা এবং পিতা শহীদুল ইসলামের জ্যেষ্ঠ সন্তান সারা ইসলাম। সারা ইসলামের একটি ছোট ভাই আছে। অঙ্গদাতা সারা ইসলাম জন্মের মাত্র ১০ মাস বয়সে দুরারোগ্য টিউবেরাস স্কে¬রোসিস রোগে আক্রান্ত হন। তিনি এ রোগ নিয়ে প্রায় ১৯ বছর ধরে লড়াই করে গেছেন । এ লড়াই করার পথ পরিক্রমায় সারা ইসলাম অগ্রনী গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি এবং হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ইউনিভার্সিটি অব ডেভলভমেন্ট আল্ট্রারনেটিভে (ইউডা) ফাইন আর্টসে ভর্তি হন। সারা ইসলাম ফাইন আর্টসের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী ছিলেন। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে প্রয়াত সারা ইসলামের নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে জানজায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোঃ শারফুদ্দিন আহমেদসহ বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক, চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ শরীক হন । সকলে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। এরপর তাঁকে পারবারিকভাবে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোঃ শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে ব্রেন ডেথ কমিটিকে সক্রিয় করে তুলি। আমরা সকলে বিশ্বাস করি, ক্যাডাভেরিক রোগী অঙ্গদানের মাধ্যমে অসংখ্য অসুস্থ্য রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এ লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্যা কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ১৯৯৯ সালে মানবদেহে অঙ্গপ্রতিস্থাপন সংক্রান্ত মহান জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। সেই আইনের আলোকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আমি পদাধিকার বলে জাতীয় ক্যাডাভেরিক কমিটির সভাপতিও বটে। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রেন ডেথ কমিটি ও কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সেলের সহযোগীতায় ক্যাডাভেরিক রোগীর দেহ থেকে অঙ্গদানের প্রক্রিয়া সফল করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ইতিপূর্বে আমরা এ ধরণের দুই একটি রোগীর ক্ষেত্রে সফল হতে গিয়েও অঙ্গদানে রাজী করাতে পারিনি। কিন্তু আমরা আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছি। তারই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা সফল হয়েছি। বাংলাদেশের চিকিৎসা শাস্ত্রের জগতে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পেরেছি। এজন্য আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট সেলের প্রধান, ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোঃ হাবিবুর রহমান দুলাল ও তার টিমকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান প্রশাসন দায়িত্বগ্রহণ করার পর চিকিৎসাক্ষেত্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন করার উদ্যোগ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ‘মুজিব শতবর্ষ লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রোগ্রাম” সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবটিক সার্জারির চালুর ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে আমাদের অনেক চিকিৎসকে বিদেশে রোবটিক সার্জারির উপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। কাটাছেড়া ছাড়া ভেরিকোজ ভেইন সোজাকরণের অত্যাধুনিক মেশিনও চালু করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কাজকে আরও বেগবান করার জন্য এ খাতে বরাদ্দ পাঁচগুণ বৃদ্ধি করেছে। গবেষণা খাতে বরাদ্দ ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২২ কোটি ২০ লক্ষ টাকায় উন্নীত করেছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে একসঙ্গে ২৪ চিকিৎসক গবেষককে পিএইচডি কোর্সে ইনরোলমেন্ট করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Email this to someone
email
Print this page
Print
Pin on Pinterest
Pinterest

দৈনিক নবচেতনার ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন