ঢাকা, সোমবার, ২৭শে জুন, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বৈশ্বিক সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রধানমন্ত্রীর ৪ প্রস্তাব

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাপী সংহতি জোরদার করার এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনা মহামারির কারণে খাদ্য, বিদ্যুৎ ও আর্থিক সংকট মোকাবিলায় সু-সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বৈশ্বিক সংকট কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে চারটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন।

শুক্রবার (২০ মে) রাতে জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে প্রথমবারের মতো ‘চ্যাম্পিয়নস গ্রুপ অব গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স ফর ফুড, এনার্জি অ্যান্ড ফাইন্যান্স’ এর বৈঠকে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এ প্রস্তাব রাখেন।

তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনের যুদ্ধ এমন এক সময়ে এসেছে যখন বিশ্ব কোভিড-১৯ মহামারি থেকে উদ্ধার পেতে লড়াই করে চলেছে। এ যুদ্ধ ইতিমধ্যে নাজুক বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুতর চাপ যুক্ত করেছে।’

বিশ্ববজুড়ে আর্থিক এ সংকট মোকাবিলায় নিজেকে গ্লোবাল সাউথের একজন প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি এই সংকটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লাখো মানুষের কণ্ঠস্বরকে এই টেবিলে পৌঁছে দিচ্ছি।’

তিনি জানান, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) এবং উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে (এসআইডি) সবচেয়ে বেশি ক্ষতি বইতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তাদের জন্য সহায়তার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা করতে হবে।

সংকট মোকাবিলায় নিজের ভাবনা তুলে ধরে এসময় চার প্রস্তাব রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রথম প্রস্তাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের বৈশ্বিক সংহতি জোরদার করতে হবে এবং সুসমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে জি-৭, জি-২০, ওইসিডি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরু দায়িত্ব রয়েছে।’

‘আমি দেখে খুশি হয়েছি যে, এই গ্রুপের স্টিয়ারিং কমিটিতে প্রধান সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো তৈরির জন্য আমরা তাদের পূর্ণ সমর্থন দেব।’

দ্বিতীয় প্রস্তাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাৎক্ষণিক প্রয়োজন হল বৈশ্বিক লজিস্টিক এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যঘাত মোকাবিলা করা। এটা পণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।’

‘বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং রপ্তানি আয় পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সমর্থনও থাকতে হবে, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ এবং অন্যান্য দুর্বল দেশগুলির জন্য। এছাড়া, উন্নত অর্থনীতি ও বহুপাক্ষিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে এবং শুল্কমুক্ত-কোটামুক্ত বাজারে প্রবেশাধিকার এবং আরও সহজলভ্য আর্থিক ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তৃতীয় প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, কার্যকর খাদ্য সঞ্চয় ও বিতরণ ব্যবস্থার জন্য কৃষি খাতের জন্য প্রযুক্তি সহায়তা এবং বিনিয়োগের ওপর আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, ‘নবায়যোগ্য জ্বালানি খাতে, বিশেষ করে এলডিসিগুলোতে (স্বল্পোন্নত দেশ) ব্যবসার ক্ষেত্রে আনকোরা অনেক সুযোগ রয়েছে।’

এই বিষয়গুলো এগিয়ে নিতে বিদ্যমান উত্তর-দক্ষিণ,দক্ষিণ-দক্ষিণ এবং ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে বলে তিনি জানান। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

সবশেষে ৪৮-সদস্যের ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সভাপতি হিসেবে উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র (এসআইডি) এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নাঞ্চলীয় দেশগুলোর জন্য কাজের সুযোগ পাওয়ার কথা তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সেসব দেশে কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা গুরুতর চাপের মধ্যে রয়েছে।’

এসময় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের উদ্যোগ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের জাতীয় উন্নয়ন যাত্রায় উদ্ভাবনী অনেক জলবায়ু কার্যক্রম রয়েছে।’

‘আমরা অন্যদের সুবিধার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন, জীব-বৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের জ্ঞান, বোঝাপড়া এবং অভিজ্ঞতা তাদের জানাত চাই।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতায় দৃঢ় বিশ্বাসী। আমরা সব সময় বৈশ্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়েছি ‘

শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতি হিসেবে ভয়ঙ্কর সব চ্যালেঞ্জের মুখেও আমাদের সহনশীলতার পরিচয় রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারি তার সর্বশেষ উদাহরণ।’

বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তবে ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অত্যন্ত অস্থিতিশীল করে তুলেছে।’

‘সরবরাহের স্বল্পতা এবং খাদ্য, জ্বালানিসহ অন্যান্য পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ইততিমধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে।’

জাতিসংঘ মহাসচিব মহামারি এবং তার পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের উদ্যোগগুলো তুলে ধরেন।

সামাজিক-নিরাপত্তা-বেষ্টনী কর্মসূচিকে সম্প্রসারিত করে নিয়মিত ১ কোটিরও বেশি মানুষের কাছে খাদ্য এবং নগদ অর্থ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

কার্ড ইস্যু করার মাধ্যমে প্রান্তিক ১ কোটি মানুষকে ভর্তুকি মূল্যে (৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কম দামে) ভোজ্যতেল, ডাল, চিনির মতো ভোগ্যপণ্য বিক্রি করার কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনা জানান, তার সরকার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় খাদ্য সংগ্রহ অভিযান জোরদার করেছে। পণ্য সংগ্রহের জন্য একাধিক উৎস অনুসন্ধান করছে। এছাড়া, কৃষকদের মধ্যে সার বিতরণ করেছে এবং উৎপাদন বাড়াতে ৮৫ শতাংশ মূল্য সহায়তা দিয়েছে।

তিনি জানান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর চাপ কমাতে বিলাসবহুল সামগ্রীর আমদানি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া, অনুমোদিত উপায়ে পাঠানো রেমিট্যান্সের জন্য ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।