থাইরয়েড রোগের সচেতনতা ও আধুনিক চিকিৎসায় গুরুত্ব দিলেন বিশেষজ্ঞরা

পীযূষ কুমার বিশ্বাস

‘Thyroid Care Through Education, Innovation and Intervention’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির (বিটিএস) অষ্টম আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল হোটেল সোনারগাঁওয়ে দিনব্যাপী এ সম্মেলনে থাইরয়েড রোগ নির্ণয়, আধুনিক চিকিৎসা, জটিল রোগের ব্যবস্থাপনা ও গবেষণার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।

সকাল ৮টায় নিবন্ধন ও সম্মেলন কিট বিতরণের মধ্য দিয়ে দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর সোসাইটির প্রমোশনাল ভিডিও প্রদর্শন এবং সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত প্লেনারি সেশনে তিনটি বিষয়ে আলোচনা হয়। সকাল ১১টায় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। বক্তব্যে তিনি বলেন, মানুষের জন্য মানসম্মত ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। থাইরয়েডসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক সমাজ, গবেষক এবং সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগীদের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির ভূমিকার প্রশংসা করে সম্মেলনে অংশ নেওয়া সবাইকে দেশের স্বার্থে নিরলসভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. এম এ করিম এবং ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান।

স্বাগত বক্তব্য দেন বিটিএসের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. নাসরিন সুলতানা। সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফৌজিয়া মোসলেম সাবেক সভাপতি হিসেবে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিটিএসের সভাপতি ও নিনমাসের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী বলেন, বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ থাইরয়েড-সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন। এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটি কাজ করে যাচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্তদের একটি বড় অংশ নারী; তাঁদের অনেকেই নিজেদের রোগ সম্পর্কে জানেন না। এ ছাড়া শিশুদের মধ্যেও থাইরয়েড সমস্যা দেখা যায়।

সম্মেলনের প্রি-কনফারেন্স কর্মশালায় থাইরয়েড নডিউল শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা জানান, উচ্চ রেজল্যুশনের আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে থাইরয়েড নডিউলের বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ে সহায়তা পাওয়া যায়। নডিউলের ধরন ও রোগীর অবস্থা বিবেচনায় পর্যবেক্ষণ, অস্ত্রোপচার কিংবা রেডিওফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশনের মতো চিকিৎসাপদ্ধতি বেছে নেওয়া যেতে পারে।

দিনব্যাপী তিনটি বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে থাইরয়েড রোগের জটিল কেস, ক্লিনিক্যাল রিজনিং, থাইরয়েড ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের আধুনিক পদ্ধতি, থাইরয়েড-সম্পর্কিত চোখের রোগ, রোগী পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হয়।

সোহরাওয়ার্দী ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জিনাত জাবীন ‘The Evolving Role of Nuclear Medicine in the Management of Differentiated Thyroid Carcinoma’ শীর্ষক বক্তব্য দেন। অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের কার্যকারিতার পরিবর্তন এবং কখন চিকিৎসা প্রয়োজন, তা নিয়ে আলোচনা করেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম বাংলাদেশে আয়োডিনের ঘাটতিজনিত সমস্যা নিয়ে বক্তব্য দেন। এ ছাড়া অধ্যাপক ডা. এম শওকত কবির থাইরয়েড-সম্পর্কিত চোখের রোগের লক্ষণ, মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনা তুলে ধরেন।

অন্যান্য আলোচনায় ছিল ডিফারেনশিয়েটেড থাইরয়েড ক্যানসারে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নাকি অস্ত্রোপচার—চিকিৎসা সিদ্ধান্তের বিভিন্ন দিক, থাইরয়েড নিওপ্লাজম শনাক্তকরণে নিডল কোর বায়োপসির ব্যবহার ও সীমাবদ্ধতা, রেডিওঅ্যাকটিভ আয়োডিন চিকিৎসার জন্য রোগী নির্বাচন এবং থাইরয়েডের কার্যকারিতার সঙ্গে হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক। রেডিওআয়োডিন-প্রতিরোধী থাইরয়েড ক্যানসারে দীর্ঘমেয়াদি রোগী পরিচর্যা ও চিকিৎসা-পরবর্তী জটিলতা নিয়েও আলোচনা হয়।

দুপুরের বিরতির পর বিকেলে ফ্রি পেপার ও পোস্টার সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১২টি মৌখিক গবেষণাপত্র ও ১০টি পোস্টার উপস্থাপন করা হয়। গবেষণার বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল বাংলাদেশে অনির্ণীত থাইরয়েড রোগের প্রকোপ, থাইরয়েড অটোইমিউনিটি, রেডিওআয়োডিন চিকিৎসার পর লালাগ্রন্থির ক্ষতি, বাংলাদেশি রোগীদের জিনগত বিশ্লেষণ এবং বিরল রোগের কেস রিপোর্ট।

বিচারকদের মূল্যায়নের পর বিটিএসের উপদেষ্টা ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যরা সেরা উপস্থাপকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।

বিকেল ৫টা থেকে ৬টা পর্যন্ত সোসাইটির বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সমাপনী বক্তব্য ও চা-বিরতির মধ্য দিয়ে সম্মেলনের কার্যক্রম শেষ হয়।