ফরিদপুর ব্যুরো
ছাত্রদলের রাজনীতি দিয়ে পথচলা শুরু। এরপর দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উতরাই, মামলা-হামলা, কারাবরণ ও প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ফরিদপুর জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে উঠে এসেছেন জাহাঙ্গীর হোসেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকার কারণে এবার ফরিদপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে তার নাম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের একটি অংশ জাহাঙ্গীর হোসেনকে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চান বলে জানিয়েছেন তার সমর্থকেরা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের কারণে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেলে তিনি জনগণের সমস্যা আরও কাছ থেকে বুঝে কাজ করতে পারবেন। জাহাঙ্গীর হোসেন মরহুম নাসির উদ্দিন মাতুব্বর ও হালিমা বেগমের তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সবার ছোট। তিনি ১৯৯৬ সালে এসএসসি পাস করেন। এসএসসি পাসের পরপরই ছাত্রদলের রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। এরপর সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে করতে ধীরে ধীরে জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বে উঠে আসেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং দলের দুঃসময়ে মাঠে থাকার অভিজ্ঞতা তাকে নেতাকর্মীদের কাছে পরিচিত করে তুলেছে বলে তার অনুসারীদের দাবি। বর্তমানে তিনি ফরিদপুর জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
তৃণমূলের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা
জাহাঙ্গীর হোসেনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম শক্তি হিসেবে তার সমর্থকেরা তৃণমূলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগের বিষয়টি সামনে আনছেন। ইউনিয়ন, ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তার পরিচিতি তৈরি হয়েছে বলে তারা জানান।
তৃণমূলের কয়েকজন নেতাকর্মীর ভাষ্য, দলের সুসময় ও দুঃসময়—দুই সময়েই জাহাঙ্গীর হোসেনকে মাঠে সক্রিয় দেখা গেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে তিনি তৃণমূলের বাস্তবতা সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত। ফলে উপজেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেলে সাধারণ মানুষের সমস্যা চিহ্নিত করে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে তারা মনে করেন।
একজন তৃণমূল কর্মী বলেন, “আমরা এমন নেতৃত্ব চাই, যিনি মাঠের মানুষকে চেনেন, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং সাধারণ মানুষের কথা শুনতে পারেন। জাহাঙ্গীর হোসেন দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির মাঠে আছেন। তাই তাকে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে আমাদের আগ্রহ রয়েছে।”
উন্নত ও মানবিক সদর উপজেলার স্বপ্ন
সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ফরিদপুর সদর উপজেলাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবিকতা ও নাগরিক সেবায় সমৃদ্ধ একটি আধুনিক ও মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলাই তার স্বপ্ন।
তিনি বলেন, “এমন একটি সদর উপজেলা প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচার ও বৈষম্যের কোনো স্থান থাকবে না। জনগণ যাতে ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে চাই।”
নিজের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে দীর্ঘ ১৭ থেকে ১৮ বছর রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। আন্দোলন করতে গিয়ে ছয়বার কারাবরণ করেছি। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ফ্যাসিবাদমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয় থেকেই আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা।”
তিনি আরও বলেন, “দল আমাকে মনোনয়ন দিলে বিএনপির চেয়ারম্যান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের আদর্শকে তৃণমূলের মানুষের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে পৌঁছে দিতে কাজ করব। ফরিদপুর সদরকে একটি মানবিক, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও জনকল্যাণমুখী উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করব। একই সঙ্গে তারেক রহমানের নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করতে এবং বিএনপির আদর্শ বাস্তবায়নে নিজেকে সর্বাত্মকভাবে নিয়োজিত রাখব।”
‘মাঠের রাজনীতি থেকে উঠে আসা সংগঠক’
অম্বিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আলম বলেন, “জাহাঙ্গীর হোসেন দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থাকা, তৃণমূলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং সাধারণ মানুষের কথা শোনার মানসিকতা তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় শক্তি।”
তিনি বলেন, “জাহাঙ্গীর ভাই মাঠের রাজনীতি থেকে উঠে আসা একজন অভিজ্ঞ সংগঠক। ফরিদপুর সদর উপজেলার মানুষের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের যে সম্পৃক্ততা, তা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। দল যদি তাকে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে কাজ করার সুযোগ দেয়, তাহলে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সদর উপজেলার সাধারণ মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আমি মনে করি।”
?বাল্যবন্ধুর চোখে জাহাঙ্গীর হোসেন
জাহাঙ্গীর হোসেনের বাল্যবন্ধু ও সহপাঠী সাগর আহমেদ বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি জাহাঙ্গীরকে কাছ থেকে দেখেছেন। একই সঙ্গে বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনার সুবাদে তার ব্যক্তিত্ব, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং রাজনৈতিক আদর্শ সম্পর্কে দীর্ঘদিনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
সাগর আহমেদ বলেন, “১৯৯৬ সালে এসএসসি পাস করার পর থেকেই জাহাঙ্গীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। এরপর দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের রাজনৈতিক পথচলায় সে অনেক প্রতিকূলতা, ত্যাগ, মামলা-হামলা ও নানা চড়াই-উতরাই পার করেছে। কিন্তু এত বছর পরও মানুষের জন্য কাজ করার আগ্রহ তার মধ্যে কমেনি।”
তিনি আরও বলেন, “জাহাঙ্গীরের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—সে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে জানে। মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া এবং এলাকার মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। রাজনীতিকে সে শুধু পদ-পদবির বিষয় হিসেবে দেখেনি; মানুষের সেবা করার মাধ্যম হিসেবেই দেখেছে।”
বাল্যবন্ধু হিসেবে জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বের সম্ভাবনা তুলে ধরে সাগর আহমেদ বলেন, “জাহাঙ্গীরের কাছে রাজনীতি মানে মানুষের অধিকার, এলাকার উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সে যদি ফরিদপুর সদর উপজেলার নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, নাগরিক সেবা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি মানবিক ও আধুনিক সদর উপজেলা গড়ে তুলতে আন্তরিকভাবে কাজ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
দলীয় সিদ্ধান্তই বড় বিষয়
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কিংবা তৃণমূলের জনপ্রিয়তা কোনো নির্বাচনে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। দলীয় সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক সমর্থন, স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সমর্থন—সবকিছু মিলিয়েই একজন প্রার্থীর সম্ভাবনা নির্ধারিত হয়।
ফলে জাহাঙ্গীর হোসেনকে ঘিরে তৃণমূলের আগ্রহ ফরিদপুর সদর উপজেলার রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করলেও শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ছাত্রদলের রাজনীতি দিয়ে শুরু হওয়া দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা তাকে এখন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এনেছে। দলীয় মনোনয়ন ও স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাকে শেষ পর্যন্ত কোন অবস্থানে নিয়ে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
