মোঃ রুহুল আমিন রাজু, জামালপুর প্রতিনিধি:
ক্লুলেস হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করে ঘটনায় জড়িত মূল আসামিকে গ্রেফতার করেছে জামালপুর সদর থানা পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও ধারাবাহিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশের এ সাফল্য এলাকায় প্রশংসিত হয়েছে।
জামালপুর জেলার পুলিশ সুপার মোছাঃ ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, “কোনো হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে; এই মামলার আসামি গ্রেফতার ও রহস্য উদঘাটন তারই একটি সফল দৃষ্টান্ত।”
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জামালপুর সদর উপজেলার নান্দিনা পুরাতনপাড়ার বাসিন্দা মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে বুলু মিয়া পেশায় হোটেল মেসিয়ার ছিলেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে ইফতার করে তিনি নান্দিনা বাজারের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর আর বাড়িতে ফেরেননি।
পরদিন ১ মার্চ ২০২৬ সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে জামালপুর সদর থানাধীন নামা গজারিয়া এলাকার জনৈক সামসুল হকের বসতবাড়ির দক্ষিণ পাশে ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর পাড়ের পানিতে একটি অজ্ঞাত পুরুষের মরদেহ পাওয়া যায়। খবর পেয়ে বুলুর ছেলে মুরসালিন ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি তার বাবা বুলু মিয়ার বলে শনাক্ত করেন।
এ ঘটনায় নিহতের ছেলে মুরসালিনের দেওয়া সংবাদের ভিত্তিতে জামালপুর সদর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু হয়। পরে মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসক মতামত দেন, বুলু মিয়াকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এরপর নিহতের মাতা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পান জামালপুর সদর থানার এসআই মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান। জামালপুর জেলার পুলিশ সুপার মোছাঃ ফারহানা ইয়াসমিনের দিকনির্দেশনায় এবং সদর থানার অফিসার ইনচার্জ নাজমুস সাকিবের সার্বিক তত্ত্বাবধানে তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার রহস্য উদঘাটনে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা শুরু করেন।
দীর্ঘ অনুসন্ধানের একপর্যায়ে গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে মূল আসামি মোঃ পলাশ মিয়া (২০), পিতা—মোঃ শহিদুল ইসলাম ওরফে সেন্টু মিয়া, সাং—নান্দিনা পুরাতনপাড়া, জামালপুর সদর, জামালপুরকে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত পলাশ মিয়া নিহত বুলু মিয়ার সঙ্গে মাদক ক্রয়ের টাকা নিয়ে বিরোধের কথা জানায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বিরোধের জের ধরে বুলুকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে পলাশ পুলিশকে জানায়, ঘটনার দিন রাতে কয়েকশ টাকার মদ কিনে বুলু মিয়াকে একসঙ্গে মদ পান করার প্রস্তাব দেয় সে। পরে বুলু রাজি হলে তারা অটোরিকশাযোগে চরগোবিন্দবাড়ী গ্রামের পীরের বাড়ির পাশে নদীর পাড়ে যায় এবং সেখানে মদ পান করে।
পুলিশের দাবি, একপর্যায়ে বুলু মিয়া মাতাল হয়ে পড়লে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পলাশ তার প্যান্টের পকেট থেকে একটি ওড়না বের করে বুলুর গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে। পরে মরদেহ নদীর পানিতে ফেলে কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রেখে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে যায়।
পুলিশ আরও জানায়, গ্রেফতারকৃত আসামি পরবর্তীতে বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে।
জামালপুর সদর থানার অফিসার ইনচার্জ নাজমুস সাকিব বলেন, “তদন্তে প্রযুক্তিগত ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসে এবং আসামি গ্রেফতারের মাধ্যমে ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে আমরা সফল হয়েছি।”
তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “মামলাটি ক্লুলেস হওয়ায় শুরু থেকেই আমরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে ধারাবাহিকভাবে তদন্ত এগিয়ে নিয়েছি; শেষ পর্যন্ত মূল আসামিকে আইনের আওতায় আনতে পেরে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।”
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় ও কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
