ঢাকা, শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২০, ১৫ কার্তিক, ১৪২৭

সন্ত্রাসের জনপদ বেগমগঞ্জের ৮ ইউনিয়ন, ‘১৯ বাহিনী’তে ঘুম হারাম

সম্রাট ও সুমনসহ ১৯টি সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছে রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের আটটি ইউনিয়নের বাসিন্দা। এসব বাহিনীর সদস্যদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশেই যেন চলে এলাকাগুলোর সার্বিক কার্যক্রম।

কোনো কোনো সময় প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্তরাও তাদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। এসব সন্ত্রাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন, লুটপাট, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষসহ নানা অপকর্ম যেন একরকম স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

তারা এতটাই শক্তিশালী যে, ভোট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনেও বিশেষ ভূমিকা রাখে তারা।

ক্যাডার বাহিনীগুলোর অত্যাচারে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হত্যা ছাড়া অন্য কোনো নির্যাতনের ব্যাপারে ভয়ে কেউ আইনের শরণাপন্ন হন না।

শুধু তাই নয়, রাতে ওই সব সন্ত্রাসীর উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই আতঙ্কে ঘরের বাতি বন্ধ করে দেন স্থানীয়রা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নানা উৎকণ্ঠায় দীর্ঘদিন এলাকাবাসীর ‘ঘুম হারাম’ বললেও অতিরঞ্জিত হবে না-এমন মন্তব্য অনেকেরই।

তবে সম্প্রতি বেগমগঞ্জে গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ফেসবুকে ভাইরালের ঘটনার পর ওইসব সন্ত্রাসী গা-ঢাকা দেয়ায় আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিতে আছেন গ্রামবাসী।

এদিকে সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে যুবকদের একটি অংশ নিজেরাই বাহিনী গড়ে তুলছে। তাদের উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নেয়া। পাশাপাশি ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে এক বাহিনী ভেঙে সৃষ্টি হয়েছে আরেক বাহিনীর।

এভাবেই দিনে দিনে গড়ে উঠেছে এ পর্যন্ত ১৯টি সন্ত্রাসী বাহিনী। আয়তনে ৪২৬ বর্গকিলোমিটারের উপজেলার প্রায় অর্ধেকে রয়েছে এসব বাহিনীর দৌরাত্ম্য।

নোয়াখালীর শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র বেগমগঞ্জ পূর্বাঞ্চলের তিন ইউনিয়ন ও পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচ ইউনিয়নে সরেজমিন ঘুরে পাওয়া গেছে উল্লিখিত সব তথ্য।

ইউনিয়নগুলো হল : পূর্বাঞ্চলের ৭নং একলাশপুর, ১৫নং শরীফপুর ও ১৪নং হাজিপুর এবং পশ্চিমাঞ্চলের ১নং আমান উল্যাপুর, ২নং গোপালপুর, ৪নং আলাইয়ারপুর, ৫নং ছয়ানি ও ৬নং রাজগঞ্জ।

বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি, ভুক্তভোগীরা জানান, এই আট ইউনিয়নে বিভিন্ন ক্যাডার বাহিনীর কাছে এখন কয়েকশ’ দেশি-বিদেশি অবৈধ অস্ত্র রয়েছে।

নিজেদের বিভিন্ন অপকর্মে অস্ত্রের ব্যবহারের পাশাপাশি তারা অস্ত্র বিক্রি করে এবং ভাড়াও দেয়। আমান উল্যাপুর, আলাইয়ারপুর ও ছয়ানি-এই তিন ইউনিয়নে বিপুলসংখ্যক বেশি দেশি-বিদেশি অস্ত্র রয়েছে বলে জানান একটি ক্যাডার বাহিনীর একজন সদস্য।

উপজেলার অন্য আট ইউনিয়নে ছোট ছোট কিছু বাহিনী সৃষ্টি হলেও এবং প্রতিষ্ঠিত কিছু বাহিনীর প্রভাব থাকলেও সেখানে এখনও পুরোপুরি ‘বাহিনী কালচার’ গড়ে ওঠেনি।

এলাকায় সন্ত্রাসী বাহিনী আছে স্বীকার করে নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মামুনুর রশীদ কিরন বলেন, তাদের (সন্ত্রাসী) বিষয়ে আমরা খুবই কঠোর অবস্থানে ছিলাম এবং আছি। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

নোয়াখালীর পুলিশ সুপার (এসপি) আলমগীর হোসেন বলেন, যেসব বাহিনীর কথা বলা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। আমাদের কাছে যারাই অভিযোগ নিয়ে এসেছে-ব্যবস্থা নিয়েছি।

তবে গ্রেফতারের পর এদের অনেকে আবার জামিনে বেরও হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অনেক সময় ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতে চান না। আমরা তাদেরকে আইনের দ্বারস্থ হওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।

বেগমগঞ্জের বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্য এবং বাহিনীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে-এমন ১১ জনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা প্রায় অভিন্ন তথ্য দিয়ে জানান, ছোট গ্রুপ হলেও একেকটা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে সর্বনিু ১০-১৫টি অস্ত্র আছে।

যারা সরাসরি গোলাগুলিতে অভ্যস্ত। উপজেলার প্রধান দুই বাহিনী সম্রাট ও সুমন বাহিনীসহ কয়েকটি গ্রুপের নিজস্ব গাড়ি আছে। তবে দুর্গম এলাকা হওয়ায় বেশিরভাগ সময়েই তারা চলাচল করে মোটরসাইকেলে।

অস্ত্র বহনে অধিকাংশ সময় ব্যবহার করা হয় সিএনজিচালিত অটোরিকশা। কিছু কিছু বাহিনীর রয়েছে আলাদা পোশাক ও বুলেট প্রুফ জ্যাকেট। যেগুলো ‘অপারেশনের’ সময় তারা পরিধান করে।

‘অপারেশন’ সাধারণত রাতেই হয়। সে জন্য ব্যবহার করা হয় উন্নত মানের টর্চলাইট। এতে শত্রুপক্ষের অবস্থান খুব সহজেই জানা যায়।

জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বলছে, বেগমগঞ্জে গত দু’বছরে এসব বাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে খুন হয়েছেন ১৭ জন। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে অর্ধশতাধিক।

আর গত নয় মাসে বেগমগঞ্জে খুন হয়েছেন ১৩ জন। থানায় ধর্ষণের অভিযোগ পৌঁছেছে ৯টি।

এই সন্ত্রাসী জনপদের নামটি আলোচনায় আসে গত ২ সেপ্টেম্বর একলাশপুরে বিবস্ত্র করে নারী নির্যাতনের ঘটনায়। এ ঘটনার ভিডিও ৩২ দিন পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়।

এতে জড়িত ছিল স্থানীয় দেলোয়ার বাহিনী বা মামা বাহিনীর সদস্যরা। সুমন বাহিনীর ছত্রছায়ায় দেলোয়ার নিজেও একটি বাহিনী গড়ে তুলে একলাশপুরসহ আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।

বেগমগঞ্জের প্রধান দুই বাহিনীর একটি এই সুমন বাহিনীর প্রধান সুমন ওরফে খালাসি সুমন ৩৬ মামলার আসামি। আরেক পক্ষের নেতৃত্ব দিচ্ছে ৩৮ মামলার আসামি সম্রাট বাহিনীর প্রধান সম্রাট।

একলাশপুর ইউনিয়নের জয়কৃষ্ণপুরের গাবুয়া খালের পাশেই দেলোয়ার বাহিনীর নির্যাতনের শিকার ওই নারীর বাড়ি। দুর্গম এই এলাকার ভাঙাচোরা ও কর্দমাক্ত বিভিন্ন রাস্তায় দিনের বেলায়ও গা ছমছমে অবস্থা।

মঙ্গলবার এই বাড়িটিতে দেখা যায়, সেখানে মোট তিনটি ঘর রয়েছে। ভুক্তভোগী নারীর জরাজীর্ণ বসতঘরের দরজাটি কাপড়ের ফিতা দিয়ে বেঁধে লাগানো ছিল। সেটি খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি দুটি বেড়া।

তবে এই ঘরে কোনো খাট বা চৌকি কিছু নেই। মাঝে আর কোনো দরজাও নেই। একটু সামনে এগোতেই দেখা যায় মাটির ওপর একটি বিছানা পড়ে আছে।

তার ওপর একটি কম্বল ও ২টি বালিশ এবং আশপাশে ওই নারীর কাপড়-চোপড় ছড়ানো-ছিটানো। ঘরে তেমন কোনো আসবাবপত্রও নেই। ঘরের পূর্বদিকের সম্মুখভাগের দরজা ছাড়া উত্তর পাশে যে দরজাটি রয়েছে, সেটির অবস্থাও নড়বড়ে।

যে শৌচাগারটি রয়েছে, তাতেও কোনো দরজা নেই। এর থেকে অনুমেয়, সেদিন খুব সহজেই তারা ঘরের ভেতরে ঢুকেছিল।

আর এই ঘর থেকে যেভাবে ওই নারী চিৎকার করছিল, তা অবশ্যই বাড়ির অন্য দুই ঘর এবং পাশের বাড়ির মানুষের শোনার কথা।

তাহলে তারা কেন এগিয়ে আসেনি? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে প্রতিবেদকের কথা হয় প্রতিবেশী ও পড়শিদের সঙ্গে।

এ বিষয়ে বাড়ির পূর্ব ঘরের বাসিন্দা ও সেই রাতে বাড়িতে অবস্থান করা দশম শ্রেণির এক ছাত্রী বলেন, ‘আমরা চিৎকারের শব্দ শুনেছি। কিন্তু বের হওয়ার সাহস করিনি। কারণ, আমরাও তো মেয়েমানুষ। ঘরে কোনো পুরুষও থাকে না। আমাদের নিরাপত্তা কী? এখান থেকে থানা অনেক দূরে। আর আমরা ফেসবুকও চালাই না যে, ঘটনাটা কাউকে জানাব। রাস্তাঘাটের অবস্থাও ভালো না। কথা বললে কেউ শুনবেও না। সে জন্য তাদের শব্দ শুনে আমরা লাইট অফ করে ঘরে বসেছিলাম। পরের দিন ঘটনা শুনেছি।’

পাশের বাড়ির অধিবাসী ও নির্যাতিত নারীর আত্মীয় মো. দ্বীন ইসলাম বলেন, দেলোয়ার সিএনজি ড্রাইভার ছিল। সেখান থেকে মাস্তান হয়েছে। সে বিভিন্ন সালিশ-দরবার করার নামে টাকা নিত।

একজনকে পিস্তল ঠেকিয়ে পুকুরের সব মাছ ধরে নিয়েছে। তিনি বলেন, সেদিন সব শুনলেও ভয়ে সেখানে যাইনি।

ভুক্তভোগী নারীর মুদি দোকানি বাবা বলেন, ঘটনা শুনেছি। কিন্তু আমাদের কিছুই করার ছিল না। তাই আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি। ওপরওয়ালাই বিচার করেছেন।

ভুক্তভোগী নারী জানান, তাদের (নিপীড়নকারী) ১০-১২ জনের ভয়ে বাড়ির বাইরে চলে গিয়েছিলেন তিনি। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি শুরুতে দেলোয়ারের নামে মামলাও করেননি।

এমনকি আদালতে ২২ ধারার জবানবন্দিতেও নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের কারণে দেলোয়ারের নাম বলেননি।

এই এলাকার আরও চার অধিবাসীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা প্রত্যেকেই জানান, গাবুয়া খালের ওপর ব্রিজে গভীর রাত পর্যন্ত মাদক সেবন করত দেলোয়ার বাহিনীর লোকজন। কারও কিছু বলার ছিল না। উল্টো তাদের নজর এড়াতে ভয়ে তারা দ্রুত ঘরের বাতি বন্ধ করে দিত।

একলাশপুরে ‘কাতা রাসেল’ নামের একজনের আরও একটি সক্রিয় বাহিনী রয়েছে। এই গ্রুপের সক্রিয় সদস্য হল হৃদয় ও তুহিন। যারা আবার সম্রাট বাহিনীর ছত্রছায়ায় কাজ করে।

সুমন বাহিনীর ছত্রছায়ায় থাকা দেলোয়ার বাহিনীর সঙ্গে এদের বিরোধ রয়েছে। স্থানীয় বাদলও দেলোয়ারের সঙ্গে কাজ করত। তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল শরীফপুর, হাজীপুর ও এখলাসপুর-এই তিন ইউনিয়নের মিলনস্থল ‘নতুন ব্রিজ’ এলাকা।

শুধু একলাশপুরে নয়, এমন ভীতিকর পরিবেশের চিত্র বেগমগঞ্জের অসংখ্য গ্রামে বিরাজ করছে। বাহিনীর অত্যাচার যেন এসব এলাকার অধিবাসীদের জন্য নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একলাশপুরের এ ঘটনার পর ৯ অক্টোবর গোপালপুরের চানকাশিমপুরে কুপ্রস্তাবে প্রবাসীর স্ত্রী রাজি না হওয়ায় ওই বাড়িতে হামলা ও ভাংচুর চালায় সন্ত্রাসী সাদ্দাম বাহিনী। পরে ৯৯৯-এ কল করে সাদ্দাম বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পান ওই নারী।

আলাইয়ারপুরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে ৪টি বাহিনী কাজ করে বলে জানা গেছে। সেগুলো হল : টিটু গ্রুপ, শাহাবুদ্দিন গ্রুপ, লিটন গ্রুপ ও শাকিল গ্রুপ। এসব গ্রুপের অধিকাংশ সদস্যের বয়স ১৫-২৫ বছরের মধ্যে।

স্থানীয়রা জানান, গত দু’মাস আগে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি কামরুল হাসান মিলন বাহিনীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখায় এক যুবক এলাকায় গেলে ধাওয়া করা হয়। পরে পুকুর সাঁতরে পার পায় সে। এ সময় তার সঙ্গে থাকা যুবলীগ নেতা মনাকে কুপিয়ে জখম করে তারা।

এই ইউনিয়নের মোশাকপুর গ্রামের অজিউল্লাহ নামের একজন মুক্তিযোদ্ধা এলাকায় একটি বাড়ি করছিলেন। এতে শাকিল ও লিটন বাহিনী ৫০ হাজার টাকা চাঁদা চায়। না দিলে মুক্তিযোদ্ধার ছেলে সোলায়মান সুমনকে হামলা করে মাথা ফাটিয়ে দেয়।

এ ঘটনায় ৩২৬ ও ৩৮৫ ধারায় বেগমগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়। বাহিনীর সদস্যরা এ এলাকায় ইয়াবা সিন্ডিকেটও নিয়ন্ত্রণ করে।

বর্তমানে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় থাকলেও এদের অধিকাংশই ইতঃপূর্বে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিল বলে জানা গেছে। তবে আলাইয়ারপুরের দুর্ধর্ষ টিটু বাহিনীর প্রভাব রয়েছে ছয়ানি ইউনিয়নেও।

একলাশপুরের সম্রাট বাহিনীর ‘ডানহাত’ বলে পরিচিত মোহাম্মদ আলী ও রবিন হত্যায় টিটুর সম্পৃক্ততার কথা জানা যায়। খালাসী সুমনের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

এ এলাকায় ভবনের কাজ করতে হলে, বিয়ে করে বউ তুলে আনতে হলে, ব্যবসা করতে গেলে-বাহিনীগুলোর চাঁদা দাবির অসংখ্য ঘটনা আছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

শরীফপুর ও হাজীপুরে আধিপত্য বিস্তার করছে সম্রাট বাহিনী, সুমন বাহিনী ও জুয়েল বাহিনী। হাজীপুরের একটি অংশ চৌমুহনী পৌরসভায় পড়েছে।

৮নং হাজীপুর পৌরসভার ওই ওয়ার্ডটিতেও রয়েছে তাদের আধিপত্য। সম্রাট ও সুমনের বাহিনীকে মূলত বেগমগঞ্জের প্রধান দুই বাহিনী হিসেবে ধরা হয়।

হত্যা, নির্যাতন, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবসাসহ অসংখ্য অপরাধে নাম এসেছে এই দুই বাহিনীর। স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এই দুই বাহিনীকে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করতে দেখা গেছে।

যে কোনো নির্বাচন এলেই এই দুই বাহিনীর তৎপরতা বেড়ে যায়। এর ফলে বেগমগঞ্জের রাজনীতিতে এই দুটি নাম বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

তারা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগকে পুঁজি করে পশ্চিমাঞ্চলের অন্যান্য বাহিনীর ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সম্রাট ও সুমন বাহিনীর সব মিলিয়ে অর্ধসহস্র সদস্য রয়েছে বলে জানা গেছে।

গত ২৯ এপ্রিল বিয়ের অনুষ্ঠানে সুমন বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মো. মাহফুজুর রহমান ওরফে ফিরোজকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে সম্রাট বাহিনীর সদস্যরা-এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

লক্ষ্মীপুর সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন আমান উল্যাপুরে রয়েছে সবুজ বাহিনী, ধোপা মামুন বাহিনী, নিজাম-বিশু বাহিনী এবং জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত পিয়াস-জহির বাহিনী (সাবেক মন্নান বাহিনীর সদস্যরা এখন এই বাহিনীতে আছে)।

এর মধ্যে সবুজ বাহিনীর ঘাঁটি ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড কোয়ারিয়ায়। তার নিয়ন্ত্রণে এই এলাকায় চলে মাদক ব্যবসা। এই বাহিনীতে প্রায় ৩০-৪০ জন সদস্য আছে।

তার ডানহাত ডন নাইমুল। তার কাছে বিপুল পরিমাণে দেশীয় অস্ত্র আছে। তার বিপরীতে এ এলাকায় আরেকটি বাহিনী গড়ে উঠেছে। এই বাহিনীর প্রধান মামুন ওরফে ধোপা মামুন।

তার গ্রুপেও ২০-৩০ জনের মতো সদস্য আছে। তার কাছে দেশি-বিদেশি অস্ত্র আছে বলে জানান স্থানীয়রা। এলাকায় চাঁদাবাজি ও জুয়ার বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে।

এই দুই গ্রুপের মধ্যবর্তী আরেকটি গ্রুপ হল নিজাম-বিশু গ্রুপ। এদের কাজ হল দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাধানো।

এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স পরিচয়ে র‌্যাব-পুলিশে তুলে দেয়ার কথা বলে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়রা জানান, এরা দু’জনেই ডাকাত দলের সদস্য ছিল। ইউনিয়ন যুবদলের রাজনীতি করত। এদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা রয়েছে।

গোপালপুর ইউনিয়নে সক্রিয় রয়েছে মাছুম বাহিনী। তার বাড়ি ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামে। এই দলে সক্রিয় কর্মী রয়েছে ২৫-৩০ জন। দেশীয় তৈরি এলজিসহ বিভিন্ন বিদেশি অস্ত্র তাদের কাছে আছে বলে জানা যায়। এলাকায় মাদকের সঙ্গে জড়িত এই বাহিনী।

পাশের উপজেলার সোনাইমুড়ীর জাকের বাহিনীর সঙ্গে মাছুম বাহিনীর বিরোধ আছে। তাদের মধ্যে একাধিকবার গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। স্থানীয়রা জানান, এর মূলে রয়েছে মাদক ব্যবসা।

এ ছাড়া এই এলাকায় রয়েছে একটি ভয়ংকর কিশোর গ্যাং। কিশোর মাস্তান ‘শিশু রাসেল’ এর নিয়ন্ত্রক। তার গ্রুপে প্রায় ২০-২৫ সদস্য রয়েছে। এলাকার বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে তারা জড়িত।

এ ছাড়া বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে তার সখ্য রয়েছে বলে জানান এলাকাবাসী। বিএনপি অধ্যুষিত ছয়ানি ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তার করছে রাসেল বাহিনী, জাবেদ বাহিনী ও বাবু বাহিনী।

রাজগঞ্জে রয়েছে মিলা-সুজন বাহিনী ও মঞ্জু বাহিনী। এরমধ্যে জাবেদ বাহিনী ও মিলা-সুজন বাহিনী বেশ কয়েকটি বড় সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এলাকার মাদকের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ নিয়েই মূলত তাদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

মঞ্জুর কাছে সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ এমএম পিস্তলসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অস্ত্র রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। সে একাধিক মামলার আসামি বলে জানা গেছে।

মন্তব্য করুন