দুর্গাপূজা ও বিচ কার্নিভাল ঘিরে পর্যটকের ঢল নামার সম্ভাবনা, কুয়াকাটায় ৮০ শতাংশ হোটেল কক্ষ অগ্রিম বুকিং

সৌমিত্র সুমন, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি

কলাপাড়া, ২০ অক্টোবর ২০২৬: শারদীয় দুর্গাপূজা, টানা পাঁচ দিনের ছুটি ও দুই দিনব্যাপী বিচ কার্নিভালকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর হয়ে উঠছে সাগরকন্যা কুয়াকাটা। পর্যটকদের আগমন ঘিরে সাজ সাজ রব পড়েছে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। ইতোমধ্যে আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়েছে। কোনো কোনো হোটেলে গুরুত্বপূর্ণ ছুটির দিনগুলোতে সব কক্ষই বুকড। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ সময়ে দুই থেকে তিন লাখ পর্যটক ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটতে পারে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটিকে ঘিরে পর্যটকদের এ বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আগামী ২৩ ও ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে দুই দিনব্যাপী বিচ কার্নিভাল। জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির যৌথ আয়োজনে এ উৎসবে স্থানীয় ও দেশের খ্যাতনামা কণ্ঠশিল্পী ও চলচ্চিত্র তারকাদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিচ ম্যারাথন, বিচ ফুটবলসহ নানা আয়োজন থাকছে।

বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের ধারণা, কার্নিভাল ও দুর্গাপূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে এবার কুয়াকাটার পর্যটন খাতে উল্লেখযোগ্য কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হবে। পর্যটকদের আগমন বাড়লে হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় অন্যান্য পেশার মানুষের আয়ও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও পর্যটন ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম মিরন বলেন, কুয়াকাটায় ৩০০টির বেশি আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার পর্যটকের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা আছে। বাড়তি পর্যটকের চাপ সামাল দিতে আশপাশের পাঁচটি গ্রামের অনেক বাসাবাড়িও হোমস্টে হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

হোটেল সরোয়ার প্যারাডাইসের ব্যবস্থাপক রিপন সাব্বির জানান, তাঁদের হোটেলের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ ইতোমধ্যে বুকিং হয়েছে। অনেক পর্যটক ফোন করে কক্ষ চাইলেও চাহিদার তুলনায় সীমিত কক্ষ থাকায় সবাইকে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

কুয়াকাটা সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলাসের সহকারী ব্যবস্থাপক আল আমিন খান উজ্জ্বল বলেন, তাঁদের কটেজ ও ভিলার প্রায় ৭০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে শতভাগ বুকিং হয়ে যেতে পারে বলে তাঁরা আশা করছেন।

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, দুর্গাপূজার ছুটি প্রতিবছরই পর্যটকদের আগমনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির হোটেলগুলোর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হলেও তৃতীয় শ্রেণির অনেক হোটেলে এখনো কক্ষ খালি রয়েছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কিছু হোটেল ভাড়ায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করেছে।

প্রেসিডেন্ট পার্কের স্বত্বাধিকারী ও পৌর যুবদলের সভাপতি মো. কাজী ফারুক জানান, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁসহ পর্যটননির্ভর প্রায় ১৬টি পেশার পাঁচ থেকে সাত হাজারের বেশি শ্রমিক পর্যটকদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত রয়েছেন। এ ছাড়া শতাধিক প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইডের পাশাপাশি পর্যটনসংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতের আরও দুই শতাধিক কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

পর্যটকদের নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সৈকত ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যসচিব মো. আরিফুজ্জামান এবং কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক থানা পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে নিয়ে সৈকত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এর আগে গত ১৫ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে বিচ কার্নিভাল ও দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের অংশগ্রহণে প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়।

কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক বলেন, দুর্গাপূজার ছুটি ও বিচ কার্নিভাল উপলক্ষে কুয়াকাটাকে নতুন রূপে সাজানো হচ্ছে। পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহিপুর থানা পুলিশ, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ট্যুরিস্ট পুলিশের কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ নাজমুল আহসান জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ, থানা পুলিশ ও বন বিভাগের পাশাপাশি সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারিও জোরদার করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যসচিব মো. আরিফুজ্জামান বলেন, বিচ কার্নিভালে স্থানীয় ও দেশবরেণ্য কণ্ঠশিল্পী এবং চলচ্চিত্র তারকাদের অংশগ্রহণে দুই দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ আয়োজন ঘিরে কুয়াকাটায় বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, দুর্গাপূজা ও বিচ কার্নিভালকে ঘিরে পর্যটকদের এ সম্ভাব্য ঢল কুয়াকাটার পর্যটন ব্যবসায় নতুন গতি সঞ্চার করবে। একই সঙ্গে হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।