ব্যুরো চীফ, ফরিদপুর
ফরিদপুরে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মাত্র একদিনেই নতুন করে ১০ শিশুর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, টিকাদানে ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাব এই সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট ও অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে চিকিৎসা সেবায় তৈরি হয়েছে চরম ভোগান্তি। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকেল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এদিন পর্যন্ত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে মোট ২৪ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও এখনও বেশ কয়েকজন শিশু জ্বর, শরীরে লাল ফুসকুড়ি এবং শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছে। হাসপাতালজুড়ে রোগীর চাপ, শয্যার তীব্র সংকট
সরাসরি হাসপাতাল পরিদর্শনে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ড এবং জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী আসছে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে। কিন্তু প্রয়োজনীয় শয্যা না থাকায় অনেক শিশুকে মেঝেতে পাটি বা চাদর বিছিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। গরম আবহাওয়া, ভিড় এবং অপর্যাপ্ত সেবার পরিবেশ মিলিয়ে অসুস্থ শিশুদের কষ্ট আরও বেড়ে যাচ্ছে। অনেক অভিভাবকই অভিযোগ করেছেন, পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় সঠিকভাবে শিশুর যত্ন নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুর মা নাছিমা আক্তার বলেন, “গত তিন দিন ধরে আমার ছেলের জ্বর ছিল। পরে শরীরজুড়ে লাল দানা দেখা দেয়। অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নিয়ে আসি। কিন্তু এখানে এসে দেখি সিট নেই, অনেক কষ্টে জায়গা করে থাকতে হচ্ছে।” একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান আকবর মুন্সি। তিনি বলেন, “আমার মেয়েকে গতকাল ভর্তি করেছি। কোনো শয্যা পাইনি। মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা চলছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে, পরিস্থিতি খুবই খারাপ।” টিকাদানে ঘাটতি, বাড়ছে ঝুঁকি চিকিৎসকরা বলছেন, হামের প্রকোপ বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে টিকাদানে ঘাটতি। নিয়ম অনুযায়ী শিশুদের নির্দিষ্ট বয়সে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হলেও বাস্তবে অনেক শিশু এই টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. গণেশ কুমার আগারওয়াল জানান, বর্তমানে তাদের হাসপাতালে ৬ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, “ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে অন্তত দুজন কোনো ধরনের হাম টিকা নেয়নি। এটি খুবই উদ্বেগজনক বিষয়।”স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সরকারি হিসেবে দেশে প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হলেও আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপে এ হার প্রায় ৮৪ শতাংশ। এই ব্যবধানই সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও নেই মৃত্যুর খবর ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান জানান, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত জেলায় ৪২টি শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, যা কিছুটা স্বস্তির বিষয়। তিনি বলেন, “আমরা আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা এবং রোগ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তবে অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো খুবই জরুরি। সময়মতো টিকা দিলে এই রোগ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।”
সংক্রামক রোগ হিসেবে হামের ঝুঁকি বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা দ্রুত একজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আক্রান্ত শিশুর হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্য শিশুর শরীরে সংক্রমণ ঘটায়। এই রোগের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—উচ্চ জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরে লাল ফুসকুড়ি। অনেক ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে, যা শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
করণীয় কী?
ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, হামের সংক্রমণ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ। পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা শিশুকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার দেওয়া পাতলা পায়খানা দেখা দিলে তরল জাতীয় খাবার খাওয়া মুখে মাস্ক পরিধান করা জ্বর বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ:
বর্তমান পরিস্থিতিতে ফরিদপুরের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবার ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। প্রয়োজনীয় শয্যা, জনবল এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই সংক্রমণ আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়ন, শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের দাবি উঠেছে।
সচেতনতা বাড়ানোই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ:
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করলেই হবে না—একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। অনেক অভিভাবক এখনও টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নন। ফলে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা, গণমাধ্যমে প্রচার এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। ফরিদপুরে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি একটি সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়ন এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা বৃদ্ধি—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই এ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অভিভাবকদের সচেতনতা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগই পারে শিশুদের এই প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে নিরাপদ রাখতে।
