নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ। বছরের শুরুর তুলনায় এ সংখ্যা ২৮ লাখ বেশি।
গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বন্যায় কৃষির ক্ষতি, শিশুদের অপুষ্টি এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্যসহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০তম সম্মেলনে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের মধ্যে এবার বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হচ্ছে। বিভিন্ন জরিপে দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির চিত্রও উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জনগোষ্ঠীর একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে এই ঝুঁকি আরও বাড়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
শিশুদের পুষ্টি নিয়ে উদ্বেগ
ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যসংকট ও পুষ্টিহীনতা শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা ও বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া এবং খাদ্যে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি শিশুদের শারীরিক বিকাশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চার শিশুর একজন খর্বকায়, অর্থাৎ বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম। এ ছাড়া ১১ শতাংশ শিশু ক্ষীণকায়, অর্থাৎ উচ্চতার তুলনায় ওজন কম। প্রতি পাঁচটি পরিবারের দুটিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অণুপুষ্টির ঘাটতি রয়েছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় দেশের প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ২ লাখ ৩০ হাজার কৃষক পরিবার এবং প্রায় ১৩ লাখ মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে খাদ্য উৎপাদন ও মানুষের জীবিকার ওপর।
খাদ্যনিরাপত্তায় বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকির প্রভাবের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে ওই অঞ্চল থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ব্যাহত হলে দেশের অর্থনীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ বাড়তে পারে।
২০২২ সালের শুরুতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশে খাদ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। এরপর কয়েক মাস খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে অবস্থান করে। বর্তমানে তা ১০ শতাংশের নিচে নেমেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সেপ্টেম্বরের হিসাবে, ওই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং দাম বাড়ার হার আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস, মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত ১৩ অক্টোবরের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে যেতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। এতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, বাজারে মোটা চালের কেজি কমপক্ষে ৫০ টাকা। খোলা আটার দামও একই।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় ৮ লাখ ৩৪ হাজার টন চাল ও গম বিতরণ করা হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ পরিমাণ ৪৮ হাজার টন কম। তবে দেশে প্রায় ২৩ লাখ ৫০ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে দ্রুত সহায়তার পরামর্শ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, খাদ্যসংকটের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের পরিবার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নারীপ্রধান পরিবার এবং দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের জন্য খাদ্যসহায়তা, ন্যায্যমূল্যে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি এবং লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তার পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন।
সেলিম রায়হান আরও বলেন, বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও কারসাজি ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
