হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দেওয়ার জন্য চারটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করেছে পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাওয়া জাপানি কনসোর্টিয়াম। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেনজিস এভিয়েশন, সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডানাটা।
প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রকসংক্রান্ত ছাড়পত্রের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে একটি প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করবে জাপানি কনসোর্টিয়াম। এরপর নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং লাইসেন্স দেবে বেবিচক।
বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান বাসসকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানটি তৃতীয় টার্মিনালে যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি কাজ করবে। তবে কার্গো হ্যান্ডলিং বিমানের অধীনেই থাকবে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের আওতায় রয়েছে যাত্রী চেক-ইন, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, উড়োজাহাজে সেবা, র্যাম্প পরিচালনা এবং উড়োজাহাজের দ্রুত ওঠানামার প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রস্তাব
চারটি প্রতিষ্ঠানেরই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাসসের পর্যালোচনা করা তুলনামূলক তথ্যে দেখা যায়, মেনজিস ৬৫টি দেশের ৩৪৭টি বিমানবন্দরে, সুইসপোর্ট প্রায় ৩১০টি বিমানবন্দরে, ডানাটা ৩৫টি দেশের ১৪৬টি বিমানবন্দর বা স্থানে এবং সেলেবি পাঁচটি দেশের ৬০টির বেশি বিমানবন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
বাংলাদেশে মেনজিসের প্রস্তাবে প্রথম বছরেই ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। গ্রাউন্ড সাপোর্ট সরঞ্জাম, বিমান চলাচল প্রযুক্তি, কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও পরিচালন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এ অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
প্রস্তাব অনুযায়ী, মেনজিসের কার্যক্রম চালু হলে এক হাজারের বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান হতে পারে, যার প্রায় ৯৯ শতাংশ বাংলাদেশি কর্মীর জন্য নির্ধারিত। পাশাপাশি প্রায় সাড়ে চার হাজার পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথাও বলা হয়েছে। বিমানবন্দর এলাকায় প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর প্রত্যাশা
বিমান চলাচল খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অপারেটর যুক্ত হলে ব্যাগেজ সরবরাহ, যাত্রী চেক-ইন, উড়োজাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড এবং সামগ্রিক সেবার মান উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।
মেনজিসের মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট চার্লস ওয়াইলি জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ থেকে প্রথম ব্যাগেজ ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে এবং শেষ ব্যাগেজ ৪০ মিনিটের মধ্যে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। এ জন্য রিয়েল-টাইম স্ক্যানিং, ডিজিটাল ব্যাগেজ সমন্বয় ও কার্যসম্পাদন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, তৃতীয় টার্মিনালের অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ও সুযোগ-সুবিধার সর্বোচ্চ সুফল পেতে অভিজ্ঞ অপারেটর প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের জনবলের দক্ষতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
টিএএস এভিয়েশন গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম মজিবুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা, নিরাপত্তা, নিয়মনীতি অনুসরণ এবং সেবার মান উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।
বিমান চলাচল বিশ্লেষক এ টি এম নজরুলের মতে, নির্বাচিত অপারেটরের কার্যক্রম ব্যাগেজ সরবরাহের সময়, উড়োজাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড, সরঞ্জামের প্রাপ্যতা, নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবার মতো পরিমাপযোগ্য সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
জাপানি কনসোর্টিয়ামটি গঠিত হয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি লিমিটেড, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশনকে নিয়ে। চুক্তিসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে কনসোর্টিয়ামটি তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে।
