ভরা বর্ষায়ও পানির মুখ দেখেনি গাজীখালী নদী

মোঃ ফরিদুল ইসলাম, সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ)

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় নদী কাটার পর থেকে আর পানি আসে না। আগে ছোটবেলায় নদীতে ট্রলার চলতে দেখছি, চলত বড় বড় নৌকা। পানিতে ভরে যেত, ছিল স্রোত। কত মাছ মারতাম। এখন নদীটাই আর নেই নদীর মতো নেই ।’ কথাগুলো বলছিলেন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার আব্দুল মজিদ।

তিনি হাঁটছিলেন গাজীখালী নদীর বুক ধরে। বর্ষার শুরুতে যে নদী থাকার কথা ছিল পানিতে টইটম্বুর, সেখানে এখন মানুষ পার হচ্ছে হেঁটে। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি জমে আছে, তবে তা প্রায় ঢেকে গেছে কচুরিপানায়। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এটি একটি নদী, নাকি পরিত্যক্ত জলাভূমি। একসময় যে নদী ছিল সাটুরিয়ার অর্থনীতি, যোগাযোগ ও জীবিকার অন্যতম ভিত্তি, সেই। অস্তিত্ব সংকটে।স্থানীয়দের ভাষ্য, শত বছরেরও বেশি আগে গাজীখালী নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল সাটুরিয়া বাজার। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বড় বড় নৌকায় ব্যবসায়ীরা আসতেন এই বাজারে। বর্তমানে গোপালপুর থেকে সাটুরিয়া বাজার পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার নদীপথের অধিকাংশ গেছে শুকিয়ে। সাটুরিয়া থেকে ধামরাইয়ের বারবারিয়া এলাকা পর্যন্তও একই অবস্থা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল গাজীখালী নদী পুনঃখননের। সাটুরিয়া, ধামরাই ও সিংগাইর অংশে নদীখননে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাটুরিয়া অংশে দুই দফায় নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে ব্যয় করা হয়েছিল প্রায় ১৬ কোটি টাকা।প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী, নদী দুই মিটার গভীর করে খনন এবং তলদেশে ২৬ মিটার ও ওপরের অংশে স্থানভেদে ৫০ থেকে ৬০ মিটার প্রশস্ত করার কথা ছিল। খননকাজে এক্সক্সকাভেটর ব্যবহারেরও নির্দেশনা ছিল। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও নদীর নাব্য ফেরেনি। বরং খননের নামে অনিয়ম হয়েছে। এ কারণে মেলেনি প্রকল্পের সুফল।সাটুরিয়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গাজীখালী নদীর উৎপত্তি গোপালপুর এলাকায় ধলেশ্বরী নদী থেকে। এরপর এটি ধামরাই হয়ে মিশেছে বংশী নদীতে। একসময় বর্ষা মৌসুমে ধলেশ্বরী নদী থেকেপানি যেত গাজীখালীতে। এতে নদীটি পানিতে ভরে উঠত এবং আশপাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত থাকত। নদীর এই পানির ওপর নির্ভর করেইপরিচালিত হতো কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, একসময় সাটুরিয়া বাজারের খাদ্যগুদাম পর্যন্ত ছিল গাজীখালীর বিস্তৃতি। কিন্তু নদী এখন হয়ে পড়েছে সংকুচিত। বিভিন্ন অংশে পানিপ্রবাহ নেই বললেই চলে। জেলে পরিবারগুলো মাছ শিকার করতে না পেরে বাধ্য হচ্ছে পেশা পরিবর্তন করতে। কথা হয় উপজেলার দরগ্রাম এলাকার জেলে জ্যোতিন রাজবংশীর সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘আগে নদীতে যেমন পানি আইত, তেমন মাছও পাইতাম। শত শত জেলে এই নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাইত। এখন নদীতে পানি নাই, মাছ মারুম কেমনে? অনেক জেলে চলে গেছে অন্য পেশায়।’

খননে ব্যয় ১৬কোটি টাকা। ‘ছোটবেলায় বর্ষার শুরুতেই গাজীখালীতে আসত নতুন পানি। তখন সবাই মাছ ধরতাম। নতুন পানিতে পাওয়া যেত প্রচুর মাছ। নদীতে দেখা মিলত শিশুকের। এখন নদীতে পানি আসে না। কয়েক বছর আগে করা হয়েছিল খনন। কিন্তু ফেরেনি নদীর নাব্য’- ক্ষোভের সঙ্গে বললেন শেখরীনগর গ্রামের জাকির হোসেন।

অবশ্য মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলছেন, তিনি যোগদানের আগেই হয়েছিল খননকাজ। এ কারণে সে বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না তিনি।তবে নদীতে পানি না আসার প্রধান কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন ধলেশ্বরী নদীর গোপালপুর এলাকার উৎসমুখ যমুনায় পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া। উৎসমুখ পুনঃখনন করা গেলে নদীতে আবারও পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

মন্তব্য করুন