ePaper

সিরাজগঞ্জে আলো দেখাচ্ছে যমুনা পাড়ের সোলার পার্ক

রফিকুল ইসলাম,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ

যমুনা নদীর পাড়ে বিস্তীর্ণ অনাবাদি ভূমির ওপর সারি সারি দৃষ্টিনন্দন সোলার প্যানেল। যা যে কোনো মানুষকেই আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যমুনার উপচেপড়া পানির ওপরে ভাসতে থাকা সোলার প্যানেলগুলো সৌন্দর্যের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে পরিত্যক্ত জমির ওপর  প্রতিষ্ঠিত এমনই একটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র আশার আলো দেখাচ্ছে।

কোনো রকম জ্বালানি ছাড়া সূর্যের আলো থেকে গত দুই বছরে দুই লাখ মেগাওয়াট আওয়ারের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে সিরাজগঞ্জ ৬৮ মেগাওয়াট সোলার পার্ক নামের প্রকল্পটি। প্রকল্পটি এরই মধ্যে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংযোজন বাড়ায় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ প্রকল্পের সফলতায় যমুনাপাড়ে অব্যবহৃত প্রায় ৯০০ একর জমিতে ৪৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। যা বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুৎ খাতকে নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায়।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবেশ বান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্প্রসারণে যমুনা পাড়ে সিরাজগঞ্জ ৬৮ মেগাওয়াট সোলার পার্ক প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয় সরকার। যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ২১৪ একর অব্যহৃত জমি লিজ নিয়ে প্রকল্পটি শুরু করে বাংলাদেশ ও চীনের দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন ভেঞ্চার কোম্পানি। বাংলাদেশের নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (ঘডচএঈখ) ও চীনের চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশনের (ঈগঈ) যৌথ উদ্যোগে গঠিত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ-চায়না রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি লি. (বিসিআরইসিএল) এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। নির্মাণ কাজ শেষে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই থেকে এটি উৎপাদনে যায়। বর্তমানে এ সোলার পার্কটি ইনস্টল ক্যাপাসিটি ৭৫ মেগাওয়াট থাকলেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে করা চুক্তি মোতাবেক ৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে। ১৬ থেকে ২২ শতাংশ প্ল্যান ফ্যাক্টর অর্জন করেছে। জ্বালানি তেল থেকে উৎপাদন খরচের চেয়ে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেকটাই সাশ্রয়ী বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দুই লাখ ১৩ হাজার ৩৪৩ ওজঊঈ (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ জবহবধিনষব ঊহবৎমু ঈবৎঃরভরপধঃব) অর্জিত হয়েছে এবং সেই সঙ্গে এক লাখ ৪২ হাজার ৯৪২ টন কার্বনডাইঅক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব হয়েছে। প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী শাকিরুল ইসলাম বলেন, এ প্রকল্পে মোট এক লাখ ৫৬ হাজার ৫৭৬টি মনোক্রিস্টালাইন বাইফেসিয়াল পিভি মডিউল স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটির ক্ষমতা ৫৪৫ কিলোওয়াট-পিক। স্থাপিত মোট ক্ষমতা ৮৫.৩৩ মেগাওয়াট পিক (ডিসি) এবং ৭৫ মেগাওয়াট (এসি)। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৭২টি ইনভার্টার, ১২টি ইনভার্টার স্টেশন এবং একটি ১০০ এমভিএ ক্ষমতাসম্পন্ন মেইন ট্রান্সফরমার রয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ ১২টি ইনভার্টার স্টেশনের মাধ্যমে ৩৩/১৩২ কেভিতে ভোল্টেজ স্তর পরিবর্তন করে ১০০ এমভিএ মেইন ট্রান্সফরমারের সাহায্যে ১০.৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি ডাবল সার্কিট ট্রান্সমিশন লাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, বিদ্যুৎখাতে আশার আলো দেখিয়েছে সিরাজগঞ্জ ৬৮ মেগাওয়াট সোলার পার্ক। বর্তমান সরকার রিনিউয়েবল এনার্জি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দিয়েছে। সেই ক্ষেত্রে সিরাজগঞ্জে যমুনার পশ্চিম তীর একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল। দ্রুত যমুনার ক্রসবার বাঁধ এলাকায় সোলার পার্কটি সম্প্রসারণ করা হলে বিদ্যুতের ঘাটতি কমবে। এদিকে সোলার পার্কটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি জমির বহুমাত্রিক ব্যবহারের লক্ষে পরীক্ষামূলকভাবে চাষাবাদ ও গবাদি পশু পালন করা হচ্ছে। বর্ষা মৌসুম শেষে সোলারের নীচে শীতকালীন সবজি চাষ ও গাড়ল পালন করা হয়।

প্রকল্প পরিচালক তানবীর রহমান বলেন, আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফুয়েলের প্রয়োজন হয় না। আন্তর্জাতিক বাজারে ফুয়েলের ক্রাইসিস এবং ফসিল ফুয়েলে পরিবেশের ওপর যে প্রভাব পড়ে তার কোনোকিছুই আমাদের ওপর পড়ছে না। আমরা প্রতিদিন ১৬ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত প্ল্যান ফ্যাক্টর অর্থাৎ তিন থেকে চার লাখ কিলোওয়াট পর্যন্ত জেনারেশন করছি। রিনিউয়েবল এনার্জি থেকে আমাদের জয়েন ভেনচার কোম্পানির টার্গেট তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার। এর অংশ হিসেবে সোলার পার্কটির পশ্চিমে বিবিএর আরও ৭০ একরের মতো অনাবাদি জমি রয়েছে যেখানে ৩৫ মেগাওয়াট ও ক্রসবার-৩ বাঁধ এলাকায় আট-নয়শ একর জমি রয়েছে যেখানে চারশ মেগাওয়াট সোলার পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আমরা সিরাজগঞ্জে এ দুটি সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র যদি দ্রুত নির্মাণ করতে পারি, তাহলে তা সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *