ePaper

সাতক্ষীরা পাসপোর্ট  অফিসে সরকারি ফির বাইরে প্রতি মাসে কয়েক লক্ষ টাকা আদায়

শেখ হাসান গফুর, সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি দালালচক্রের বিরুদ্ধে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দালালের মাধ্যমে আবেদন না করলে নানা অজুহাতে হয়রানি, আবেদন বাতিল কিংবা পাসপোর্ট ইস্যুতে অযথা বিলম্ব করা হয়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক সেবাগ্রহীতা অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে পাসপোর্ট করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, পাঁচ বছর মেয়াদি সাধারণ (রেগুলার) পাসপোর্টের সরকারি ফি ৪ হাজার ২৫ টাকা হলেও দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে আদায় করা হচ্ছে প্রায় ৬ হাজার ২০০ টাকা। একইভাবে জরুরি ও অতি জরুরি সেবার ক্ষেত্রেও সরকারি ফির চেয়ে কয়েক হাজার টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের ক্ষেত্রে ২২ কার্যদিবসের সরকারি ফি ৫ হাজার ৭৫০ টাকা হলেও আদায় করা হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার ৮০০ টাকা। ১৪ কার্যদিবসের জরুরি সেবার সরকারি ফি ৮ হাজার ৫০ টাকা হলেও নেওয়া হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার ২০০ টাকা। অন্যদিকে অতি জরুরি পাসপোর্টের সরকারি ফি ১০ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার টাকা।ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পাসপোর্ট অফিসসংলগ্ন কম্পিউটার ও অনলাইন সেবা কেন্দ্র এবং জেলার বিভিন্ন স্থানে থাকা কিছু মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এই অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অনেকের দাবি, দালাল ছাড়া নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের বাসিন্দা আহছান উল্লাহ জানান, ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের জন্য স্থানীয় এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আবেদন করতে গিয়ে তাকে প্রায় ৮ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের পলাশ মণ্ডল বলেন, পাসপোর্ট নবায়নের জন্য তার কাছ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। একই অভিযোগ করেন কলারোয়া উপজেলার দেয়াড়া গ্রামের মাসুদ। তিনি জানান, ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট করতে তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দালাল দাবি করেন, সরকারি ফির বাইরে যে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়, তার বড় অংশই সংশ্লিষ্ট অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হয়। তার ভাষ্য, প্রতি পাসপোর্টে প্রায় ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হলেও নিজের কাছে থাকে মাত্র ২০০ টাকা, বাকি অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তিকে দিতে হয়। তিনি আরও দাবি করেন, তার মাধ্যমে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০টি আবেদন জমা পড়ে এবং জেলায় শতাধিক দালাল সক্রিয় রয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে আবেদন বাতিল কিংবা দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আনসার সদস্যও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, ঘুষ ছাড়া অফিসে কোনো কাজ হয় না। এমনকি একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাকেও পাসপোর্ট করতে অতিরিক্ত ১ হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়েছে। তার অভিযোগ, ঘুষ না দিলে বছরের পর বছর পাসপোর্ট ঝুলে থাকতে পারে। তিনি আরও দাবি করেন, প্রতিটি পাসপোর্টের বিপরীতে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ অফিসের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়। ঘটনার বিষয়ে জানতে পাসপোর্ট অফিসের পাশের একটি কম্পিউটার দোকানের মালিকের সঙ্গে কথা হলে তিনি দাবি করেন, সরকারি নির্ধারিত ফি দিয়ে পাসপোর্ট করা বাস্তবে সম্ভব নয়। তিনি স্বীকার করেন, প্রতিটি পাসপোর্ট আবেদনের ক্ষেত্রে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, “আপনি অতিরিক্ত টাকা না দিয়ে একটি আবেদন করে দেখুন, কর্মকর্তারা আপনার আবেদন গ্রহণ করবেন না।” অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, যেসব আবেদনকারী অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করেন, তাদের পাসপোর্টের বিস্তারিত তথ্য অফিসের একজন কর্মকর্তার ই-মেইলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু যারা অতিরিক্ত অর্থ দেন না, তাদের কোনো তথ্য পাঠানো হয় না। ফলে পরবর্তীতে ওইসব আবেদনকারীকে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ওই দোকানদার আরও জানান, তার দোকানে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০টি পাসপোর্টের আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। প্রতিটি আবেদন থেকে আদায় করা অতিরিক্ত ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা তিনি অফিসের একজন কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে দেন বলেও দাবি করেন। বিষয়টি জানতে চাইলে সাতক্ষীরা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক আজমল কবীর বলেন, “অফিসে সবকিছু আমার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ঘুষের লেনদেন হয়, তবে ওই টাকার কোনো অংশ আমি নিই না।” তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল পাসপোর্ট অফিসে দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত, সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *