আন্তর্জাতিক ডেস্ক
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে কয়েক দশক ধরে চলা সংঘাত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশটির প্রধান মালয়-মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বারিসান রেভোলুসি ন্যাশনাল (বিআরএন) জানিয়েছে, স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
সম্প্রতি মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক বিরল সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন বিআরএনের শান্তি আলোচনাবিষয়ক প্রতিনিধি দলের মুখপাত্র নিকমাতুল্লাহ সেরি। তিনি বলেন, লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই চলবে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা এখনো সংগঠনটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
বিআরএন ১৯৬০-এর দশক থেকেই থাইল্যান্ডের মুসলিম-অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলে স্বাধীন ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে বর্তমান সংঘাতের বড় পর্ব শুরু হয় ২০০৪ সালে। ডিপ সাউথ ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় ৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী, থাই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক মানুষ রয়েছেন।
ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ থাইল্যান্ডের এই অঞ্চল মালয়-মুসলিম অধ্যুষিত পাতানি সালতানাতের অংশ ছিল। ১৯০০-এর দশকের শুরুতে তৎকালীন সিয়াম রাজ্যের সঙ্গে অঞ্চলটির রাজনৈতিক সংযুক্তি ঘটে। এরপর থেকে স্থানীয় মালয় মুসলিমদের একটি অংশ ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে।
স্বাধীনতার পাশাপাশি ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাব
২০১৩ সাল থেকে মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় থাই সরকার ও বিআরএনের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলছে। তবে বিভিন্ন সময়ে এ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে একটি হামলায় পাঁচ থাই সেনা নিহত হওয়ার পর ব্যাংকক শান্তি আলোচনা স্থগিত করে। ওই হামলায় ছয় বেসামরিক মানুষ আহত হন বলে থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সাম্প্রতিক ওই সহিংসতায় বিআরএনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অবশ্য নিকমাতুল্লাহ নিশ্চিত বা অস্বীকার করেননি।
তবে স্বাধীনতার দাবির পাশাপাশি থাই সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি কাঠামোর প্রস্তাবও দিয়েছে বিআরএন। নিকমাতুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলের চারটি প্রদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে অঞ্চল পরিচালনা করতে চায় সংগঠনটি।
বিআরএনের প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পাঁচ থেকে ১০ বছরের একটি অন্তর্বর্তী সময়ে ওই অঞ্চলের শাসনভার নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য শরিয়াহভিত্তিক পুলিশ ও আদালত ব্যবস্থা চালুর কথাও রয়েছে। এরপর জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নির্ধারণের কথা বলেছেন নিকমাতুল্লাহ।
সংলাপেই সমাধান চায় ব্যাংকক
থাই সরকারের অবস্থান হলো, রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই দীর্ঘদিনের সংঘাতের সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে কোনো সমাধান গ্রহণযোগ্য নয়।
থাইল্যান্ডের প্রধান শান্তি আলোচক থানুত সুওয়ার্নানন্দ বলেছেন, আলোচনার টেবিলে বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি। বরং সংঘাত কমানো, নিরাপত্তাব্যবস্থা শিথিল করা এবং রাজনৈতিক অভিযোগগুলোর সমাধানের বিষয়গুলোই আলোচনায় রয়েছে।
এই সংঘাতে মালয়েশিয়ার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল দেশটির সীমান্তবর্তী হওয়ায় দীর্ঘদিনের সহিংসতার প্রভাব মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলেও পড়ে। শান্তি আলোচনায় মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে।
তবে বর্তমানে নতুন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহাম্মদ খালেদ নর্দিন। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার অগ্রাধিকার শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং দেশটি থাইল্যান্ডের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে।
এদিকে শান্তি আলোচনা আবারও এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না বিআরএন। নিকমাতুল্লাহ জানিয়েছেন, অক্টোবর মাসে থাইল্যান্ডের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বা গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে।
দক্ষিণ থাইল্যান্ডের দীর্ঘদিনের সংঘাত এখন স্বাধীনতার পুরোনো দাবি, স্বায়ত্তশাসন এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাবকে ঘিরে নতুন মাত্রা পেয়েছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের অবসানে ব্যাংকক ও বিআরএন শেষ পর্যন্ত কী ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
