ePaper

শুধু বেঁচে থাকা নয়, রোহিঙ্গাদের প্রাপ্য মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ : জাতিসংঘ

নিউইয়র্ক, ২৪ সেপ্টেম্বর : দীর্ঘদিন ধরে বাস্তুচ্যুত জীবন কাটানো রোহিঙ্গাদের জন্য একটি টেকসই সমাধানের পথ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনো মিয়ানমারে তৈরি হয়নি। শুধু বেঁচে থাকা নয়, রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে বুধবার আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহ বলেন, বাংলাদেশে এখনো প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছেন। একটি পুরো প্রজন্ম নির্বাসনে বেড়ে উঠছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মিয়ানমারে সংঘাত অব্যাহত থাকায় স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান শুরুর পর কয়েক লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তাঁদের অধিকাংশই এখনো বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছেন।

মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জুলি বিশপ বলেন, ২০১৭ সালে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশুদের পুরো শৈশবই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় কাটছে। প্রতিবছর আনুমানিক ৩০ হাজারের বেশি শিশু শরণার্থী শিবিরে জন্ম নিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, শিবিরে বসবাসরত নারী ও মেয়েরাও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। সশস্ত্র গোষ্ঠী ও অপরাধী চক্রের তৎপরতার কারণে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সময়ে সুরক্ষা ও সহায়তামূলক সেবায় প্রবেশের সুযোগও কমে যাচ্ছে। তরুণদের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেন। তবে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের পুরো দায় বাংলাদেশের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না বলেও তাঁরা সতর্ক করেন।

ইউএনএইচসিআর প্রধান বারহাম সালেহ বলেন, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে গেলেও রোহিঙ্গাদের প্রয়োজন কমে যায় না। সহায়তা কমে গেলে খাদ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় সংকট তৈরি হয়। স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশাও গভীর হয়।

তিনি বলেন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের সম্ভাবনা না থাকলে রোহিঙ্গারা মানবপাচার, শোষণ, জোরপূর্বক নিয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রার মতো বিপদের আরও বেশি মুখোমুখি হতে পারেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে বাংলাদেশের ওপর তৈরি হওয়া মানবিক ও নিরাপত্তাগত চাপের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা মানবপাচার, অভিবাসী পাচার, মাদক পাচারসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নয়। বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকাল এই দায়িত্ব বহন করতে পারে না। তাঁর মতে, সংকটের সূত্রপাত মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই করতে হবে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যসহ বিভিন্ন এলাকায় চলমান সহিংসতা ও নিপীড়নের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বেসামরিক মানুষ নির্বিচার হামলা, বিমান হামলা, গ্রেপ্তার ও আটক, নির্যাতন, জোরপূর্বক গুম, জোরপূর্বক নিয়োগ এবং ঘরবাড়ি ও বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। একই সঙ্গে তাঁদের মানবিক সহায়তা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মনোযোগ প্রয়োজন। শরণার্থীদের জন্য ধারাবাহিক ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

জাতিসংঘের কর্মকর্তারা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের গণহত্যা মামলার বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাঁদের মতে, যেকোনো স্থায়ী সমাধানের অংশ হিসেবে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহির পথে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা ধরে রাখার ওপরও তাঁরা গুরুত্বারোপ করেন।

বারহাম সালেহ বলেন, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ শুধু টিকে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাঁদের প্রত্যাবাসন মানে কেবল সীমান্ত পেরিয়ে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া নয়; অধিকার নিয়ে ফিরে গিয়ে স্বাধীনভাবে চলাফেরা, শিক্ষা গ্রহণ, কাজ করা ও প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভয় ছাড়াই অন্যান্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে বসবাস এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার একটি কার্যকর পথ থাকতে হবে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য এমন একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।