মো: জাকির হোসেন জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সহ মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির পর থেকে দেশের জ্বালানি খাতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যার সবচেয়ে প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। এমন সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে সারাদেশের মতো গত কয়েক দিন ধরে স্মরণকালের ভয়াবহ লোডসেডিংয়ের কবলে পড়েছে পুরো মৌলভীবাজার জেলা। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও লোডসেডিং ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দিনের বেলা লোডসেডিং তো আছেই, সন্ধ্যার পর লোডসেডিং তীব্র আকার ধারণ করেই যাচ্ছে। ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎহীন অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে গ্রাহকদের। ২৪ ঘন্টার মধ্যে অর্ধেক সময় জুড়েই লোডসেডিং হচ্ছে। সবমিলিয়ে পুরো জেলায় ৫০ শতাংস লোডসেডিং হচ্ছে বলে পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এসএসসি পরিক্ষার্থীরা। মাত্রাতিরিক্ত লোডসেডিং থাকায় ব্যঘাত ঘটছে পড়ালেখায়। দীর্ঘ সময় টানা লোডসেডিংয়ের কবলে পড়ার কারণে রাতের বেলা চার্য লাইট ও ব্যাকাপ লাইটের আলোয় কিছুক্ষণ চললেও চার্য শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে অনেকের ক্ষেত্রে মোমবাতিই একমাত্র ভরসা। এমন পরিস্থিতিতে কবে মিলবে লোডসেডিং থেকে পরিত্রান তা কারো জানা নেই। ক্রমাগত লোডসেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে জেলার ৯২টি চাবাগানের সামগ্রীক উৎপাদনেও। এছাড়াও ব্যাবসা-বাণিজ্য সহ দৈনন্দিন কর্মঘন্টায়ও প্রভাব পড়ছে বিদ্যুতের অব্যাহত লোডসেডিংয়ের। মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি শ্রীমঙ্গল কার্যালয় এর তথ্য বলছে, জেলায় পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছেন ৪ লাখ ৮৮ হাজার। রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গ্রাহক সংখ্যার চাহিদার বিপরিতে পুরো জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ৯৬ মেগাওয়াট। তবে জাতীয় গ্রীড থেকে সর্বরাহ করা যাচ্ছে মাত্র মাত্র ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এর মধ্যে ঘাটতি রয়েছে ৩৬ মেগাওয়াটের মতো। এই পরিসংখ্যান গ্রাহক চাহিদা অনুযায়ী প্রতি ঘন্টায় পরিবর্তন হচ্ছে। শুধু মৌলভীবাজার সদর উপজেলায়ই ২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরিতে বরাদ্দ আছে সর্বোচ্চ ১২ থেকে ১৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ঘাটতি আছে ১০ মেগাওয়াট। যার কারণে উপজেলায় লোডসেডিং হচ্ছে ২৭ শতাংসের মতো। পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তাদের দাবী মূলত চাহিদার বিপরিতে বিশাল ঘাটতির কারণেই লোডসেডিং বেশি হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) মৌলভীবাজার বিতরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, জেলায় পিডিবির গ্রাহক রয়েছেন ৩৩ হাজার ৩শ ৫০ জন। এর বিপরিতে বিদ্যুত চাহিদা রয়েছে ১৮ মেগাওয়াট। সেখানে তারা গ্রাহক পর্যায়ে সর্বরাহ করতে পারছেন মাত্র ১২.৭ মেগাওয়াট বিদ্যুত। ঘাটতি রয়েছে ৬.৭ মেগাওয়াট বিদ্যুত। জেলার পল্লী বিদ্যুৎ ও পিডিবির দ্বায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদার বিপরিতে বিশাল ঘাটতির কারণেই লোডসেডিং হচ্ছে। সর্বরাহ বাড়াতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্ঠা করছেন বলেও জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এদিকে ক্রমাগত লোডসেডিংয়ের মধ্যে গত ২১ ও ২৩ এপ্রিল মৌলভীবাজার জেলা জুড়ে তীব্র কালবৈশাখীর তান্ডব চলে। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল,মৌলভীবাজার সদর, বড়লেখা,জুড়ি,কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলায় কালবৈশাখীর তান্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। শতশত গাছপালা ভেঙ্গে উপড়ে যায়। অনেক জায়গায় গাছ পড়ে সড়ক বন্ধ হয়ে সাময়িক সময়ের জন্য অচল হয়ে পড়ে। আবার অনেক জায়গায় পল্লী বিদ্যুতের লাইনের উপর গাছ ভেঙ্গে পড়ার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এমন পরিস্থিতে টানা দুই দিন মৌলভীবাজার সদর সহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। দুই দিনের কালবৈশাখীর তান্ডবে জেলার ৩৭৯ টি স্পটে বিদ্যুতের খুঁটির উপর গাছ পড়ে মোট ৩৪টি ট্রান্সফরমার সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে ৩৪ লক্ষ টাকারও বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (টেকনিক্যাল) কমলেস চন্দ্র বর্মণ।
মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) সুজিত কুমার বিশ্বাস জানান, গরম বাড়ার সাথে সাথে গ্রাহকদের চাহিদাও বাড়ছে। যার কারণে পুরো মৌলভীবাজার জেলায় ৫০ভাগ লোডসেডিং হচ্ছে। গ্রাহক চাহিদার বিপরিতে ৩৬ শতাংস ঘাটতির কারণে এখন প্রতি ঘন্টা পর পর লোডসেডিং দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎের লোডসেডিং নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। প্রয়োজনে ডিজেল দিয়ে হলেও সর্বরাহ সাভাবিক রাখতে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমরাও চেষ্ঠা করছি যত দ্রুত সম্ভব লোডসেডিং কমিয়ে আনা যায়। আশা করছি দ্রুতই সমাধান হবে।
