ePaper

নবীনগর সাধু সঙ্গের উদ্যোগে লঞ্চযোগে আনন্দ ভ্রমণ

হেলাল উদ্দিন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি:

নবীনগর সাধু সঙ্গের উদ্যোগে লঞ্চযোগে বর্ণাঢ্য এক আনন্দ ভ্রমণের আয়োজন করা হয়েছে। সোমবার সকালে নবীনগরের ঐতিহ্যবাহী লঞ্চঘাট থেকে উৎসবমুখর পরিবেশে এ আনন্দ ভ্রমণের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। নদীর বুকে নির্মল প্রকৃতি, গান-বাজনা, খেলাধুলা ও পারস্পরিক আনন্দ-উচ্ছ্বাসে দিনব্যাপী এ ভ্রমণ পরিণত হয় মিলনমেলায়।

সকাল থেকেই নবীনগর লঞ্চঘাটে ভ্রমণপ্রত্যাশী বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। নির্ধারিত সময়ে লঞ্চ ছাড়ার পর নদীর ঢেউ আর চারপাশের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে করতে আনন্দভ্রমণকারীরা নরসিংদীর আলোকবালী বালুচর ও গড়িপুরার নিঝুমদ্বীপ এলাকায় পৌঁছান। লঞ্চযাত্রার পুরো সময়জুড়েই ছিল উৎসবের আমেজ।

আনন্দ ভ্রমণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রফিকুল ইসলাম রফিক শাহ্। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নবীনগর প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাধু সঙ্গের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ হোসেন শান্তি, নবীনগর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শ্যামা প্রসাদ চক্রবর্তী, নবীনগর ধ্যানঘরের কর্ণধার আনোয়ার হোসেন, সংগীতশিল্পী অজয় মুখার্জি, নবীনগর প্রেসক্লাবের সদস্য ও পল্লী চিকিৎসক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, গুঞ্জন পাঠাগারের কর্ণধার ও বইমজুর স্বপন মিয়া, শিক্ষক নাছিমা আক্তার, মলিনা বেগম, মর্জিনা জেসমিন, ভোলাচং উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফেরদৌসী আক্তার, বাউল শিল্পী জেসমিন আক্তার, শামসুন্নাহারসহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্য এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ভ্রমণকে কেন্দ্র করে লঞ্চের ভেতর ও নদীর তীরে তৈরি হয় আনন্দঘন পরিবেশ। অংশগ্রহণকারীরা নদীর বুকে ভেসে থাকা অবস্থায় প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি গান, নাচ ও বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশ নেন। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক উৎসাহ ও উচ্ছ্বাস। কেউ গানের আসরে অংশ নিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করেন, কেউবা নাচ-গান উপভোগ করেন। আবার অনেকেই নদী ও আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি তুলে স্মৃতিকে ধরে রাখেন।

আনন্দ ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টি। বৃষ্টির পানি নদীর বুকে ছন্দ তুললেও ভ্রমণকারীদের আনন্দে কোনো ভাটা পড়েনি। বরং অনেকেই বৃষ্টিতে ভিজে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। কেউ কেউ বৃষ্টির আনন্দ উপভোগ করতে নদীর পাড়ে অবস্থান করেন, আবার অনেকে ছাউনির নিচে আশ্রয় নিয়ে বৃষ্টি উপভোগ করেন। প্রকৃতি ও মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত মেলবন্ধনে ভ্রমণের পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

দুপুরে ভ্রমণকারীদের জন্য ছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ও সহজ-সরল খাবারের আয়োজন। দুপুরের খাবারের তালিকায় ছিল দই, চিড়া, কলা ও গুড়। নদীর মনোরম পরিবেশে সবাই মিলে এসব খাবার খাওয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এক ভিন্নধর্মী আনন্দঘন আবহ। খাবারের সময়ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে চলে হাসি-আড্ডা ও গল্পগুজব।

আয়োজকরা জানান, কর্মব্যস্ত জীবনে মানুষকে কিছুটা স্বস্তি ও আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করাই এ ধরনের আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশেষ করে বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষকে একই বন্ধনে যুক্ত করে সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়াতে আনন্দ ভ্রমণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাদের ভাষ্য, বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যস্ত জীবনে মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সময় কাটানোর সুযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এ ধরনের আয়োজন মানুষকে একসঙ্গে হওয়ার, কথা বলার, আনন্দ ভাগাভাগি করার এবং পুরোনো সম্পর্কগুলোকে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। পাশাপাশি নদীমাতৃক বাংলাদেশের ঐতিহ্য, নদীর সৌন্দর্য ও নৌভ্রমণের সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত করানোর ক্ষেত্রেও এমন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

নবীনগর সাধু সঙ্গের এ আনন্দ ভ্রমণে অংশ নেওয়া অনেকেই জানান, নদীর বুকে লঞ্চে দিনব্যাপী ঘোরাঘুরি, গান-বাজনা, খেলাধুলা ও বৃষ্টিতে ভেজার অভিজ্ঞতা তাদের জন্য ছিল আনন্দময় ও স্মরণীয়। দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে গিয়ে পরিচিতজনদের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটাতে পেরে তারা আনন্দিত।

আয়োজকদের মতে, শুধু বিনোদন নয়, মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করার জন্যই ভবিষ্যতেও এ ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা রয়েছে। নদীকেন্দ্রিক বাংলাদেশের চিরায়ত সংস্কৃতি ও নৌভ্রমণের আনন্দকে ধারণ করে নবীনগর সাধু সঙ্গের এই আয়োজন অংশগ্রহণকারীদের মনে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।