ePaper

দালালমুক্ত ন্যায়বিচারের অঙ্গীকারে ফরিদপুরে আইনগত সহায়তা দিবস পালন

ব্যুরো চীফ,ফরিদপুর:

“সরকারি খরচে বিরোধ শেষ, সবার আগে বাংলাদেশ”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ফরিদপুরে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস। দিবসটি উপলক্ষে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকালে ফরিদপুর চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের দ্বিতীয় তলার কনফারেন্স রুমে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি আইনগত সহায়তা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

ফরিদপুর জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান ও সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. জিয়া হায়দারের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ আলোচনা সভায় বিচার বিভাগ, প্রশাসন এবং আইনজীবী মহলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, দেশের একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করায় তারা প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেকেই জানেন না যে সরকার বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে মামলা পরিচালনার সুযোগ দিয়ে থাকে। ফলে তথ্যের অভাব ও সচেতনতার ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।

সভায় বিভাগীয় বিশেষ জজ মো. শরিফুদ্দিন আহমেদ, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেলা জজ শামীমা রহমান, চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেলিম রেজা, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিত্র বিশ্বাস, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল কবির, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামসুল আজম এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট লিয়াকত আলী খান বুলুসহ অন্যান্য আইনজীবী ও জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সদস্যরা বক্তব্য দেন।

বক্তারা বলেন, লিগ্যাল এইড কার্যক্রমকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আরও সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ে লিগ্যাল এইড কমিটি গঠন ও কার্যকর করার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ সহজেই আইনি সহায়তা পেতে পারেন। এ জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

আলোচনায় আদালতপাড়ায় সক্রিয় দালালচক্রের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। বক্তারা অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু দালাল সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকে পুঁজি করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এবং প্রকৃত আইনি সহায়তা থেকে তাদের বঞ্চিত করছে। এসব দালালচক্র আইনের সঠিক প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এবং বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এ ধরনের অপতৎপরতা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

বক্তারা আরও বলেন, লিগ্যাল এইড সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষ আস্থা নিয়ে এই সেবা গ্রহণ করতে পারে। একই সঙ্গে আইনগত সহায়তা প্রদান প্রক্রিয়াকে সহজ, দ্রুত এবং দুর্নীতিমুক্ত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথাও তুলে ধরা হয়। এতে করে সাধারণ মানুষ হয়রানি ছাড়াই দ্রুত ন্যায়বিচার পেতে সক্ষম হবেন।

সভায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবার জন্য সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তাদের মতে, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের আইনি সহায়তার আওতায় আনতে না পারলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই সরকারি আইনগত সহায়তা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই।

এর আগে সকাল ৯টায় পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে দিবসটির উদ্বোধন করা হয়। পরে একটি বর্ণাঢ্য র?্যালি আদালত প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে দিয়ে ঘুরে পুনরায় আদালত চত্বরে এসে শেষ হয়। র?্যালিতে বিচারক, আইনজীবী, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এতে দিবসটির তাৎপর্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবসের এ আয়োজন ফরিদপুরে আইনি সহায়তা কার্যক্রমকে আরও বেগবান করবে। বক্তাদের মতে, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দালালমুক্ত, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব আইনি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সহজতর হবে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আরও সুদৃঢ় হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *