ePaper

আজও রহস্য ঘেরা সিরাজগঞ্জের বেহুলার বাড়ি

রফিকুল ইসলাম,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় বেহুলার বিনসাড়া গ্রাম। এই গ্রামটি বেহুলা-লক্ষিন্দরের স্মৃতি বিজড়িত ¯’ান হিসেবে পরিচিত। আর এই গ্রামের মাটির নিচে লুকানো সোনার নৌকা আর ‘জীয়নকূপ’নিয়ে রহস্য ঘেরা রয়েছে। ¯’ানীয়দের দাবি, এই ¯’ানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক অলৌকিক ঘটনা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, বেহুলা যখন লক্ষিন্দরের মৃতদেহ নিয়ে সোনার নৌকায় করে ভেসে যা”িছলেন, তখন বেহুলার নৌকাটি খারীর (ছোট নদী বা নালা) মধ্যে ডুবে গিয়েছিল বা এই ¯’ানেই লক্ষিন্দর প্রাণ ফিরে পেয়েছিলেন।

আজও এই ¯’ানটিতে মাটির নৌকার মতো দেখতে একটি ¯’ান রয়েছে। যা ¯’ানীয়দের কাছে ‘ডুবন্ত সোনার নৌকা’ নামে পরিচিত। ডুবন্ত নৌকার পাশেই একটি ‘জীয়নকূপ’ রয়েছে, যেখানে বেহুলা তার স্বামীকে জিন্দা করার জন্য পানি সংগ্রহ করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। বর্তমানে সংস্কারের অভাবে এই ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নটি অবহেলিত অব¯’ায় রয়েছে। তবে তাড়াশ উপজেলার নির্বাহী অফিসার জানিয়েছেন, নদী খনন প্রকল্পের আওতায় বেহুলার নদীটি খননের উদ্যোগ নেয়া হবে। বেহুলা-লক্ষিন্দরের কথা কম বেশি সবার জানা।

তথ্যমতে, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের তৎকালীন নিচানী বাজার (বর্তমানে বিনসাড়া গ্রামে)। বাছোবানিয়ার একমাত্র রূপসী কন্যা ছিলেন বেহুলা সুন্দরী। এই বেহুলার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয় বগুড়ার চম্পকনগরে চাঁদ সওদাগরের ছেলেই লক্ষিন্দরের। লক্ষিন্দররা ছিল সাত ভাই, ছয় ভাইকে সাপে কেটে মেরে ফেলে। একারনে লক্ষিন্দরের জন্য নিছিদ্র লোহার বাসর ঘর তৈরী করা হয়। সব কিছু ঠিকঠাক ছিলো তবুও হঠাই সুতানলী সাপ ঢুকে পড়ে বাসর ঘরে। এক নিমেষেই মৃত্যু গ্রাস করে লক্ষিন্দরকে। কিš‘ তাই বলে থেমে থাকেনি স্ত্রী বেহুলা। স্বামীর প্রাণ ফেরানোর অদম্য আশায়, বুক ভরা ভালোবাসায় সাপে কাটা স্বামীর দেহ নিয়ে সোনার নৌকায় শুরু হয় বেহুলার অসম্ভব যাত্রা। কথিত আছে, বেহুলার সেই কিংবদন্তি সোনার নৌকাটি বিনসাড়া গ্রামে নদীতে (ছোট নদী বা নালা) ডুবে গিয়েছিল।

বর্তমানে সেই ¯’ানে মাটির নিচে চাপা পড়া একটি নৌকা আকৃতির উঁচু ঢিবি দেখা যায়। নৌকা আকৃতির এই ঢিবি ¯’ানীয়দের কাছে বেহুলার ডুবন্ত সোনার নৌকার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে পরিচিত। এছাড়া পাশেই রয়েছে রহস্যজনক ‘জীয়নকূপ’। বছরের পর বছর কুপের জল কখনও শুকাইনা। বেহুলা এই কুপের জল ব্যবহার করতেন এবং এর অলৌকিক গুণ রয়েছে বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। এটি এমন একটি পবিত্র ¯’ান যেখানে অলৌকিক কিছু ঘটে। অনেকের বিশ্বাস এই জীয়নকূপে মানত করলে মনের আশা পুরণ হয়। এবং এই কূপের পানি পান করলে যে কোন রোগ ভালো হয়ে যায়।

অলৌকিক এই বিশ্বাস ঘিরে প্রতিদিনই দূর দূরান্ত থেকে এখানে আসেন দর্শনার্থীরা। কেউ মানত করছেন কেউ খুঁজছেন রহস্যের উত্তর। বেহুলার মাটির নিচে সোনার নৌকার গল্প আর জীবন্ত কূপ মিলিয়ে বিনসাড়া গ্রাম রহস্য আর বিশ্বাসের এক অনন্য জায়গা। বটগাছের ছায়ায় বেহুলা-লক্ষিন্দরের প্রেমের স্মৃতি: জীয়নকূপের প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন বটগাছ। ¯’ানীয়দের ভাষ্য, বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দর নাকি এই গাছের নিচে পরিচয় হয়। পরে সেখানেই বসে তারা গল্প করতেন। বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত গাছটির শত শত ঝুরি আজও অতীতের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে। বট গাছের মাঝে একটি শিব মন্দির রয়েছে। গ্রামবাসীর দাবি, প্রায় ৫৬০টি ঝুরি গাছটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা এখানে আসেন, তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও পর্যটন সুবিধার অভাবে অনেককেই ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুস সবুর (৫৫) বলেন, বেহুলার কাহিনী আমরা বাপ-দাদার কাছ থেকে শুনে আসছি। লোকমুখে প্রচলিত আছে, একসময় কেউ এই ডুবন্ত নৌকার জায়গা থেকে মাটি কাটতে গেলে অমঙ্গল ঘটত। এজন্য মানুষ এখনো জায়গাটিকে বিশেষ সম্মানের চোখে দেখে। গ্রামের অমল কুমার (৭০) নামের এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, জীয়নকূপ ও ডুবন্ত নৌকা ঘিরে বহু অলৌকিক গল্প প্রচলিত রয়েছে। ডুবন্ত নৌকার পাশেই রয়েছে রহস্যময় জীয়নকূপ। বছরের পর বছর পার হলেও এই কূপের পানি কখনও সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায় না। যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, লক্ষিন্দরের প্রাণ ফেরানোর জন্য বেহুলা এই কূপ থেকেই পানি সংগ্রহ করেছিলেন। সেই থেকেই কূপটি মানুষের কাছে পবিত্র ও অলৌকিক ¯’ান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কুপের পাশে বসবাসকারী বৃদ্ধা জতি রানী (৭৫) বলেন, শুনে আসছি, ডুবন্ত নৌকার জায়গায় কোদাল চালালে অমঙ্গল হতো। তাই আশপাশে চাষ হলেও নৌকার জায়গাটা মানুষ এড়িয়ে চলত। বর্তমানে একই অব¯’ায় রয়েছে। এই জায়গা নিয়ে মানুষের মনে এখনো ভয় আর শ্রদ্ধা দুটোই আছে। জীয়নকূপে মানত করলে মনের আশা পূরণ হয়। কেউ রোগমুক্তির আশায়, কেউ আবার কৌতূহল নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসেন বলে তিনি জানান।

¯’ানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যা”েছ এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন। দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়লেও পর্যটন সুবিধা ও গবেষণামূলক কার্যক্রম এখনও সীমিত। তাদের দাবি, সরকারি উদ্যোগে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও গবেষণা পরিচালনা করা হলে এ অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাস আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং লোক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংরক্ষিত হবে।

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, বেহুলার জীয়নকূপ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কূপের পাশাপাশি বেহুলার ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য ¯’াপনাও সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বেহুলার ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ¯’াপনা সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, যে খালপথ দিয়ে বেহুলার নৌযাত্রার স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলে ¯’ানীয়রা বিশ্বাস করেন, সেই খাল পুনঃখননের বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। পাশাপাশি প্রত্নসম্পদগুলো তালিকাভুক্ত ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতেও পরিকল্পনা রয়েছে। মাটির নিচে সত্যিই কোনো সোনার নৌকা চাপা পড়ে আছে কি না, কিংবা জীয়নকূপের পানিতে অলৌকিক কোনো ক্ষমতা রয়েছে কি না তার নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও মেলেনি। তবে শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা এই কাহিনী, বিশ্বাস ও আবেগ বিনসাড়াকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচয়। এই জনপদ তাই শুধু একটি গ্রাম নয়, এটি বাংলা লোক ঐতিহ্য, প্রেম, বিশ্বাস ও রহস্যের এক জীবন্ত অধ্যায়, যেখানে আজও বেহুলা-লক্ষিন্দর মানুষের স্মৃতি ও সংস্কৃতিতে সমানভাবে জেগে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *