প্রতিটি ঘর হয়ে উঠুক ছোট্ট মসজিদ


নবচেতনা ধর্ম ও জীবন ডেস্ক : একটি শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার পরিবার, আর প্রথম শিক্ষক তার মা-বাবা। শিশুর কোমল হৃদয়ে যে শিক্ষা, অভ্যাস ও মূল্যবোধের বীজ শৈশবে বপন করা হয়, বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা-ই তার ব্যক্তিত্ব ও জীবনাচরণে গভীর প্রভাব ফেলে।

বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষা ও ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পারিবারিক পরিবেশের ভূমিকা অপরিসীম। যে ঘরে নিয়মিত নামাজ আদায় করা হয়, কোরআন তিলাওয়াতের ধ্বনি শোনা যায়, আল্লাহর জিকির ও দোয়ার চর্চা থাকে, সে ঘরের শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই দ্বিনের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠে। কারণ শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে শেখে না, বরং মা-বাবার দৈনন্দিন কাজকর্ম ও আচরণ দেখেও অনেক কিছু আত্মস্থ করে। তাই সন্তানদের দ্বিনদার হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে নিজেদের আমল-আখলাকের পাশাপাশি ঘরের পরিবেশকেও ইবাদতমুখী করে তোলা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে ঘরের একটি নির্দিষ্ট স্থান নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের জন্য নির্ধারণ করা অত্যন্ত সুন্দর একটি উদ্যোগ হতে পারে। যেখানে পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত নামাজ আদায় করবেন, নির্জনে আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন, তাহাজ্জুদ পড়বেন এবং পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করবেন। এমন একটি নির্ধারিত স্থান ঘরের মধ্যে ইবাদতের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করবে। শিশুরা যখন প্রতিদিন দেখবে, তাদের মা-বাবা নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে নামাজ আদায় করছেন, কোরআন পড়ছেন কিংবা গভীর রাতে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে দোয়া করছেন, তখন তাদের মনেও ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেবে।

একসময় তারাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই জায়গায় গিয়ে নামাজ পড়তে ও আল্লাহকে স্মরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে।
এ জন্য ঘরের মধ্যে বড় কোনো আয়োজন কিংবা ব্যয়বহুল স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজন নেই। সামান্য একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গা সুন্দরভাবে সাজিয়ে, সেখানে জায়নামাজ, কোরআন শরিফ ও প্রয়োজনীয় কিছু ইবাদতের সামগ্রী গুছিয়ে রাখলেই তা ঘরোয়া মসজিদ বা ইবাদতের নির্ধারিত স্থান হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহেও ঘরে নামাজের জন্য নির্দিষ্ট স্থান রাখার প্রতি উৎসাহ পাওয়া যায়। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরে ঘরে ও পাড়া-মহল্লায় মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং সেগুলো পরিচ্ছন্ন ও সুগন্ধিময় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৫৫) এভাবে ঘরে নির্ধারিত নামাজের স্থান থাকার বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজের আমল থেকেও প্রমাণিত। আবদুল্লাহ ইবনে শাদ্দাদ (রা.) বলেন, তিনি তাঁর খালা এবং নবী (সা.)-এর স্ত্রী মাইমুনা (রা.)-এর কাছে শুনেছেন, তিনি হায়েজ অবস্থায় নামাজ আদায় না করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামাজের স্থানের সামনে শুয়ে থাকতেন। আর নবী (সা.) তাঁর চাটাইয়ের ওপর নামাজ আদায় করতেন। সিজদা করার সময় তাঁর কাপড়ের কিছু অংশ মাইমুনা (রা.)-এর শরীর স্পর্শ করত। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৩৩)

ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ *ফাতহুল বারি*তে এই হাদিসের ব্যাখ্যায় নামাজের স্থান বলতে ঘরের মধ্যে নামাজের জন্য নির্ধারিত জায়গার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। (ফাতহুল বারি : ১/৫৫০)

ঘরে এমন একটি নির্দিষ্ট ইবাদতের স্থান থাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা হলো, এটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নামাজের প্রতি আগ্রহ ও অভ্যাস তৈরি করে। বিশেষ করে যেসব শিশু এখনো নামাজে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি, তাদের জন্য এটি হতে পারে এক অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র। আমরা অনেক সময় ছেলেশিশুদের মসজিদে নিয়ে যাই, কিন্তু মেয়েশিশুদের সে সুযোগ দেওয়া হয় না। অথচ ঘরের মধ্যে ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকলে ছেলে ও মেয়ে উভয় শিশুই সেখানে নামাজ আদায় করতে পারবে। তারা ছোটবেলা থেকেই নামাজের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হবে এবং ধীরে ধীরে ইবাদতকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে।

এ ছাড়া ঘরের মধ্যে ইবাদতের এমন পরিবেশ থাকলে পরিবারের কোনো সদস্য নামাজে অনিয়মিত হলেও তার মধ্যে নামাজের প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে পারে। এমনকি কোনো নামাজে অবহেলাকারী অতিথি ঘরে এলে এই পরিবেশ তার মনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ একটি সুন্দর ইবাদতমুখী পরিবেশ অনেক সময় নীরবে মানুষকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করে।

সাহাবায়ে কেরামের জীবনেও ঘরে নামাজের জন্য নির্দিষ্ট স্থান রাখার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ইতবান ইবনে মালিক আনসারি (রা.) ছিলেন দৃষ্টিশক্তিতে দুর্বল। তাঁর বাড়ি থেকে গোত্রের মসজিদে যাওয়ার পথে পানি ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা থাকায় তাঁর জন্য নিয়মিত মসজিদে যাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। তাই তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আবেদন করেন, তিনি যেন তাঁর বাড়িতে এসে একটি নির্দিষ্ট স্থানে নামাজ আদায় করেন, যাতে তিনি সেই স্থানকে নামাজের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর আবেদন গ্রহণ করেন। একদিন তিনি আবু বকর (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে ইতবান (রা.)-এর বাড়িতে উপস্থিত হন। এরপর তিনি ঘরের নির্দিষ্ট একটি স্থানে নামাজ আদায় করেন এবং সাহাবিরা তাঁর পেছনে জামাতে নামাজ আদায় করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৪০)

ঘরে নির্দিষ্ট ইবাদতের স্থান থাকার আরেকটি বড় উপকারিতা হলো, সেখানে পরিবারের সদস্যরা নিরিবিলি পরিবেশে আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারবেন। বিশেষ করে রাতের শেষ প্রহরে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ থাকে, তখন সেই স্থানে দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া করার সুযোগ তৈরি হবে। একইভাবে দিনের ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের সদস্যরা কিছু সময় বের করে সেখানে বসে আল্লাহর জিকির ও ইস্তিগফার করতে পারবেন। এতে ঘরের প্রতিটি কোণে ইবাদতের আবহ ছড়িয়ে পড়বে এবং পারিবারিক জীবনে তৈরি হবে প্রশান্তি ও বরকতের পরিবেশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তুমি আমার ঘরকে পবিত্র রেখো তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী, রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১২৫)

যদিও আয়াতটি মূলত পবিত্র কাবাঘর সম্পর্কে অবতীর্ণ, তবু এর মধ্যে ইবাদতের স্থান পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখার যে শিক্ষা রয়েছে, তা থেকে আমরা অনুপ্রেরণা গ্রহণ করতে পারি। একইভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের ঘরগুলোকে কবরস্থানে পরিণত কোরো না। নিশ্চয়ই শয়তান ওই ঘর থেকে পালিয়ে যায়, যে ঘরে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭৮০)

তাই আসুন, আমাদের প্রতিটি ঘরে ইবাদতের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থান তৈরি করি। সেই স্থানকে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে প্রাণবন্ত করে তুলি। যেন আমাদের সন্তানরা ছোটবেলা থেকেই ইবাদতের আলোয় বেড়ে ওঠে, তাদের হৃদয়ে আল্লাহর ভালোবাসা ও দ্বিনের প্রতি অনুরাগ জন্ম নেয় এবং আমাদের ঘরগুলো হয়ে ওঠে ঈমান, আমল ও প্রশান্তির একেকটি ছোট্ট নীড়।
নবচেতনা/এআর