রফিকুল ইসলাম,সিরাজগঞ্জ ঃ ‘বেচাকেনা নেই, দিন চলছে না। বাড়িতে অভাব। লাউ ১৫ টাকা করে কিনেছি, মানুষ ১০ টাকা দিয়েও নিচ্ছে না। দাম বলে কী লাভ, মানুষ শুধু দাম শোনে।’ কথাগুলো বলছিলেন সিরাজগঞ্জের ভদ্রঘাট বাজারের সবজি বিক্রেতা আব্দুল বাকি। বাজারে সবজির দাম কমলেও ক্রেতা নেই বলে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। আব্দুল বাকির দাবি, কেনা দামের চেয়ে কমে বিক্রি করতে চাইলেও ক্রেতাদের আগ্রহ নেই। এতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মহাসড়কের পাশের অন্যতম জনপ্রিয় বাজার ভদ্রঘাট। প্রতি রোববার ও বৃহস্পতিবার এখানে হাট বসে। সিরাজগঞ্জ সদর, রায়গঞ্জ ও কামারখন্দ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ এ হাটে কেনাকাটা করেন। বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের সবজি তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা জানান, শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করায় কয়েক ধরনের সবজির দাম কমেছে। কিন্তু দাম কমার সঙ্গে বিক্রি বাড়ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
আব্দুল বাকি জানান, তিনি প্রতিটি লাউ ১৫ টাকায় কিনেছেন, কিন্তু ক্রেতারা ১০ টাকা দিয়েও নিতে চাইছেন না। শসা মণপ্রতি ২ হাজার ২০০ টাকায় কিনেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ক্রেতারা কেজিপ্রতি ৩০ টাকা দিতে চান। অথচ কেনা খরচ, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় তার প্রত্যাশিত দাম আরও বেশি। আব্দুল বাকি বলেন, মানুষের কাছে টাকা নেই। পাবলিকের কামাই নেই, হাতে পয়সা নেই। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। পণ্য কিনে বাজারে এনে বিক্রি করতে না পারলে লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়। কম দামে বিক্রি করলেও ক্রেতা না মিললে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহ আগে আদা ১৬০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন ১২০ টাকায় নেমেছে। রসুনের দাম আগে ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা, এখন ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি। শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়ায় ফুলকপি, কাঁচা মরিচ ও লাউয়ের দাম কমেছে। এক সপ্তাহ আগে ফুলকপি ৬০ টাকা ও কাঁচা মরিচ ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন যথাক্রমে ৪০ ও ৫০ টাকা। লাউয়ের দাম ৩০ থেকে ৪০ টাকা থেকে কমে ২৫ টাকায় নেমেছে।
কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী মো. ইদ্রিস আলী বলেন, বর্তমানে হল্যান্ডের আলু ২০ টাকা, দেশি আলু ৩০ টাকা, বেগুন ৪০ টাকা, ফুলকপি ৪০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৫০ টাকা, শসা ৪০ টাকা, মূলা ২০ টাকা ও পেঁয়াজ ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি লাউয়ের দাম ২৫ টাকা। পালংশাক তিন আঁটি ২০ টাকা।
ব্যবসায়ী মো. ইসলাম হোসেন বলেন, গত পাঁচ দিন ধরে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বেড়েছে। এক মাস আগে ফুলকপি ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন ৪০ টাকায় নেমেছে। দুই মাস আগে কাঁচা মরিচের কেজি ছিল ১২০ টাকা, এখন ৬০ থেকে ৭০ টাকা। তবে গাজর ১৬০ টাকা ও টমেটো ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মুরগির বাজারেও দামের ওঠানামা আছে। এখন ব্রয়লার ১৭০ টাকা, সোনালি ২৮০ টাকা ও লেয়ার ৩২০ টাকা কেজি।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৫ দিন আগে সোনালির দাম ছিল ২৬০ টাকা, আর এক সপ্তাহ আগে লেয়ার ছিল ৩৫০ টাকা। মুরগি ব্যবসায়ী মনিরুল ব্রয়লার হাউজের মো. জাহিদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, মানুষ ব্রয়লার বেশি খায়। ব্রয়লারের দাম অপরিবর্তিত আছে।
বাজারের দোকানদার মো. বাবলু বলেন, বর্তমানে কাটারি চাল ৭৫ টাকা এবং পোলাওয়ের চাল ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি। কিছুদিন আগে পোলাওয়ের চাল ছিল ১৫০ টাকা। এ ছাড়া মসুর ডাল ৯০ টাকা, চিকন ডাল ১৫০ টাকা, মরিচের গুঁড়া ৪০০ টাকা, হলুদের গুঁড়া ৩০০ টাকা ও খুচরা জিরা ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সয়াবিন তেল ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ব্রয়লার কিনতে আসা মো. বাবুল আক্তার বলেন, ব্রয়লারই আমাদের কাছে গরুর গোশতের মতো। কোনো দিন গরুর গোশতের দাম শুনতেও যাইনি। ব্রয়লারের দাম কমলে ভালো হয়। শীতকালীন সবজির দাম কমছে। দিনমজুর রহম শেখ বলেন, শীতের সময় তো সবজির দাম কম থাকে। সময়ের সঙ্গে দাম কিছুটা কমছে। বাজার তদারকি নিয়মিত হলে আমরা কম দামে ভালো জিনিস খেতে পারব। ৫০০ টাকার নোট দিয়ে বর্তমান বাজারে কিছুই হয় না।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সিরাজগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. সোহেল শেখ বলেন, আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি। ডিমের দাম কমেছে, তবে আদা ও রসুনের দাম কিছুটা বেশি। মনিটরিং কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়ায় এসব পণ্যের দাম কমছে।
সিরাজগঞ্জে সবজির দাম কমলেও ক্রেতা নেই
