জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে: পরিবেশমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আওয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও বন্যায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘গ্রিন ডায়ালগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভবিষ্যতের কোনো বিষয় নয়; এর ক্ষতিকর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। অতিরিক্ত গরমে কারখানার শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কমছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষিতে লবণাক্ততার সমস্যা বাড়ছে, যা কৃষিজমি ও পানীয় জলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

দেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে আব্দুল আওয়াল মিন্টু বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা ও জ্বালানি খাতের চাপসহ নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিভিন্ন সংস্থার আগামী পাঁচ বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও আগের তুলনায় কম।

বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ পূর্বাভাসের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করেছে সংস্থাটি। তবে এটি চূড়ান্ত হিসাব নয়, পূর্বাভাসমাত্র। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশের সহনশীলতা বাড়ানো প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, যথাযথ প্রস্তুতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বন্যায় উৎপাদন হ্রাস, যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন বন্ধের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম পদক্ষেপ নিতে হবে।

কৃষির গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত নয়; এর সঙ্গে গ্রামীণ কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস, বাজারের স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তা জড়িত। দেশে সেচব্যবস্থার উন্নতি হলেও কৃষি এখনো অনেকাংশে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টি—দুই পরিস্থিতিই কৃষির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

মন্ত্রী জানান, দেশের প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ১১ থেকে ১২ শতাংশ। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি ও যান্ত্রিকীকরণ প্রয়োজন। তবে যান্ত্রিকীকরণের ফলে কৃষিতে শ্রমের চাহিদা কমে কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়তে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে আব্দুল আওয়াল মিন্টু বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। একই সঙ্গে কৃষি খাত থেকেও অনেকে কাজ হারিয়ে শ্রমবাজারে আসছেন। নারীদেরও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিবছর অন্তত ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এ জন্য বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি তুলে ধরে মন্ত্রী প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত এল নিনো পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, এবারের এল নিনো গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হতে পারে। এর প্রভাবে আগামী এক থেকে দুই বছরে ঝড়-তুফান, অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে। সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সচল রাখতে অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।