হাবিবুর রহমান.গাইবান্ধা
প্লাস্টিকের থালা হাতে নিয়ে অনুষ্ঠান শেষে যেখানে ডাস্টবিন, ড্রেন কিংবা নদীতে ফেলে দেওয়াই যেন আমাদের অভ্যাস, সেখানে গাইবান্ধার এক তরুণ উদ্যোক্তা দেখাচ্ছেন ভিন্ন পথ। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিবেশ রক্ষার লড়াই শুধু সচেতনতায় নয়, কার্যকর বিকল্প তৈরির মধ্যেই নিহিত। সেই বিশ্বাস থেকেই গাইবান্ধা পৌরসভার আদর্শপাড়ায় গড়ে তুলেছেন পরিবেশবান্ধব পেপার প্লেট তৈরির একটি ক্ষুদ্র কারখানা।
সরু গলির শেষপ্রান্তে ছোট্ট একটি কারখানা। বড় শিল্পকারখানার কোলাহল নেই, নেই বিশাল যন্ত্রপাতির গর্জন। তবু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছোট ছোট মেশিনের ছন্দে তৈরি হচ্ছে অসংখ্য পেপার প্লেট। প্রতিটি প্লেট যেন পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশের একেকটি প্রতিশ্রুতি।
কারখানাটির উদ্যোক্তা রেজাউন্নবী রাজু। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এমন একটি পণ্য তৈরির স্বপ্ন দেখছিলেন, যা একদিকে হবে পরিবেশবান্ধব, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে। সেই স্বপ্নই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
কারখানায় উৎপাদিত হচ্ছে উন্নতমানের প্রিন্টেড ও সিলভার লেমিনেটেড পেপার প্লেট। মানসম্মত জিএসএম বোর্ড পেপার ও ফুড-গ্রেড ল্যামিনেশন ব্যবহারের কারণে গরম ভাত, তেল-ঝোল কিংবা অন্যান্য খাবার পরিবেশনেও প্লেটের গুণগত মান অটুট থাকে। ব্যবহারের পর সহজেই মাটির সঙ্গে মিশে যায় বলে পরিবেশের ওপরও পড়ে না কোনো দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব।
উদ্যোক্তা রেজাউন্নবী রাজু বলেন, “প্লাস্টিক আজ পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। আমরা চাই মানুষ এমন একটি বিকল্প ব্যবহার করুক, যা পরিবেশের ক্ষতি করবে না। আমাদের পেপার প্লেট যেমন মানসম্মত, তেমনি দামও সবার নাগালের মধ্যে। তাই বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, পিকনিক, রেস্তোরাঁ এবং ক্যাটারিং সেবায় এর চাহিদা বাড়ছে।”
শুধু পরিবেশ রক্ষাই নয়, এই উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ারও খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে কয়েকজন নারী এই কারখানায় কাজ করে নিজের আয় দিয়ে পরিবারের খরচে সহযোগিতা করছেন। একসময় যারা শুধুই গৃহস্থালির কাজে সীমাবদ্ধ ছিলেন, আজ তারা উৎপাদন ও প্যাকেজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস যেমন বেড়েছে, তেমনি পরিবারের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হচ্ছে।
রেজাউন্নবী রাজুর স্বপ্ন আরও বড়। তিনি বলেন, “সরকারি সহযোগিতা ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পেলে উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। তখন গাইবান্ধা থেকেই সারা দেশে পেপার প্লেট সরবরাহ করা যাবে। সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান, উপকৃত হবে স্থানীয় অর্থনীতি।”
বিশ্বজুড়ে যখন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানোর উদ্যোগ জোরদার হচ্ছে, তখন গাইবান্ধার এই ক্ষুদ্র উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পের বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এমন উদ্যোগ আরও ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই প্রত্যাশা।
আদর্শপাড়ার ছোট্ট কারখানা থেকে প্রতিদিন বের হওয়া প্রতিটি পেপার প্লেট শুধু খাবার পরিবেশনের উপকরণ নয়; এটি একটি সবুজ ভবিষ্যতের স্বপ্ন, একজন উদ্যোক্তার সাহসিকতার গল্প এবং বদলে যাওয়া বাংলাদেশের সম্ভাবনার প্রতীক।
