ePaper

মানুষের হৃদয়ে স্থান করে বিদায় নিচ্ছেন ইসলামপুরের ইউএনও নাজমুল হুসাইন সততা, সাহসিকতা, মানবিকতা ও জনবান্ধব প্রশাসনের অনন্য দৃষ্টান্ত

মোঃ রুহুল আমিন রাজু, জামালপুর প্রতিনিধি

একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার প্রকৃত সাফল্য শুধু সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে নয়, বরং মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস অর্জনের মধ্যেই নিহিত। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল হুসাইন সেই বিরল প্রশাসকদের একজন, যিনি তাঁর সততা, দক্ষতা, মানবিকতা, সাহসিকতা ও জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামপুরবাসীর হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বদলিজনিত আদেশে তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে যাচ্ছেন। তাঁর বিদায়ের খবরে উপজেলার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অসংখ্য মানুষ স্মৃতিচারণ করছেন।দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি উপজেলা প্রশাসনকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। সরকারি অফিসে সেবার মান বৃদ্ধি, জনগণের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, পৌর উন্নয়ন ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়নে তাঁর সক্রিয় নেতৃত্ব ইসলামপুরবাসীর কাছে প্রশংসিত হয়েছে।

জনস্বার্থবিরোধী কোনো ঘটনা তাঁর নজরে এলেই তিনি বিলম্ব না করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হতেন। অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বাজার মনিটরিং, ভেজালবিরোধী অভিযান, সরকারি সম্পদ রক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তাঁর দৃঢ? অবস্থান ছিল প্রশংসনীয়।সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর, সড়কের পাশ ও জনসমাগমস্থলে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন।বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভোটারদের সচেতন করতে ব্যাপক প্রচারণা পরিচালিত হয়। তাঁর নির্দেশনায় গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে গ্রাম-গঞ্জে গণসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয়, যা ভোটারদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।তাঁর মানবিকতার অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল রাস্তায় কম্বলে মোড়ানো অবস্থায় পড়ে থাকা এক নবজাতক কন্যাশিশুকে জীবিত উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং পরবর্তীতে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় শিশুটিকে একটি স্নেহময় পরিবারের কাছে দত্তক দিয়ে নতুন জীবনের সুযোগ করে দেওয়া।এছাড়াও বজ্রপাতে নিহত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেন। ইসলামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিনামূল্যে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবাকে আরও সহজলভ্য করেন।মানবিকতার আরেকটি অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেন কুকুরের সঙ্গে বসবাসকারী মানসিক ভারসাম্যহীন শ্রাবণকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়ে। তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে পরবর্তীতে জামালপুর সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বিত শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়, যা দেশজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।কৃষি উন্নয়নে কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, কৃষি বিভাগের কার্যক্রম তদারকি এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম, মসজিদভিত্তিক শিক্ষা ও ধর্মীয় কার্যক্রমের সার্বিক তদারকির মাধ্যমে সেবার মানোন্নয়নেও নজির স্থাপন করেন।পৌরসভার প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল করা, মশক নিধন কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে একাধিক কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন।উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে নিয়মিত তদারকি করেন।গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে কাঁচা ও পাকা রাস্তা নির্মাণ, সেতু-কালভার্ট নির্মাণ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করতে তিনি নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করেন। তাঁর কঠোর তদারকির ফলে অধিকাংশ উন্নয়ন কাজ নির্ধারিত সময়ে ও মানসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) বলেন, “ইউএনও নাজমুল হুসাইনের নিয়মিত তদারকি ও দিকনির্দেশনায় উপজেলার বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত হয়েছে। উন্নয়ন কাজে তাঁর আন্তরিকতা আমাদের সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে।”উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) বলেন, “দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমুখী ভূমিকা পালন করেছেন।”ইসলামপুর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, “শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে তাঁর আন্তরিক সহযোগিতা সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

ইসলামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউএনও নাজমুল হুসাইন সবসময় আন্তরিকতা ও সমন্বয়ের সঙ্গে কাজ করেছেন, যা ইসলামপুরবাসীর জন্য সুফল বয়ে এনেছে।”এছাড়াও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি বিভাগ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, কৃষক ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা জানান, নাজমুল হুসাইন ছিলেন একজন জনবান্ধব, সৎ, দক্ষ ও মানবিক প্রশাসক। তিনি শুধু সরকারি দায়িত্ব পালন করেননি, মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হয়ে কাজ করেছেন।বিদায়ের এই মুহূর্তে ইসলামপুরবাসীর প্রত্যাশা—নতুন কর্মস্থলেও তিনি একই সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে জনগণের কল্যাণে কাজ করে সাফল্যের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। ইসলামপুর ছেড়ে গেলেও একজন সৎ, মানবিক, সাহসী ও জনবান্ধব প্রশাসক হিসেবে নাজমুল হুসাইন দীর্ঘদিন মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *