হেলাল উদ্দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগর প্রতিনিধি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগর উপজেলায় অনেক এলাকায় সেচ সুবিধা সীমিত হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে কিছু জমি প্রতিবছরই অনাবাদি থেকে যেত কিংবা বোরো ধানের আবাদ কম হতো। তবে কৃষি বিভাগের পরিকল্পনা, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টা এবং কৃষকদের আগ্রহে এবার সেই জমিগুলোতেই দেখা যাচ্ছে গমের সবুজ ক্ষেত, ইতিমধ্যে সবুজ গম স্বর্ণালি আভায় রূপান্তরিত হচ্ছে। কৃষকদের চোখে নতুন সম্ভাবনা জানান দিচ্ছে। চলতি মৌসুমে উপজেলার শ্রীরামপুর, শিবপুর, ইব্রাহিমপুর, রছুল্লাবাদ, বড়িকান্দি, সাতমোড়া ও জিনদপুর ইউনিয়নে প্রায় ৫৫ হেক্টর জমিতে নতুন করে গম আবাদ হয়েছে। সবমিলিয়ে নবীনগর উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ৪০৫ হেক্টর জমিতে গম চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে রতনপুর ইউনিয়নের শাহপুর গ্রাম, ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের মধ্য ইব্রাহিমপুর, শ্রীরামপুর ইউনিয়নে এলাকায় সবচেয়ে বেশি গম আবাদ হয়েছে। শাহপুর এলাকায় একটি মাঠেই প্রায় ৫০ হেক্টরের বেশি জমিতে গম চাষ করা হয়েছে, যা স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।কৃষি বিভাগ বলছে, এ অঞ্চলের জন্য বর্তমানে বারি গম–৩৩ এবং ডাব্লিউএমআরআই–২ জাতের গম সবচেয়ে ভালো ফলন দিচ্ছে। উন্নত জাতের গম কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বড়িকান্দি, রতনপুর, ইব্রাহিমপুর ও শ্রীরামপুর ইউনিয়নে প্রায় ৪ টন বীজ সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আগামী মৌসুমে কৃষকদের মাঝে স্বল্প মূল্যে বিতরণ করা হবে।
রতনপুর ইউনিয়নের শাহপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, এ বছর তিনি ৬ বিঘা জমিতে বারি গম–৩৩ আবাদ করেছেন। তিনি আশা করছেন ফলন ভালো হলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে গম চাষ করবেন।অন্যদিকে ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের মধ্য ইব্রাহিমপুর গ্রামের কৃষক কাজী মোশাররফ হোসেন বলেন, সেচের অভাবে আগে এসব জমি প্রায়ই পতিত পড়ে থাকতো। কৃষি বিভাগের পার্টনার প্রকল্পের আওতায় এ বছর তিনজন কৃষক মিলে ডাব্লিউএমআরআই–২ জাতের গম ২ একর জমিতে আবাদ করেছেন। ভবিষ্যতে আবাদ বাড়ানোর জন্য তারা প্রায় ১ টন বীজ সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা নিয়েছেন।
উপজেলায় গম চাষের সম্ভাবনা নিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, “নবীনগর উপজেলায় কিছু জমি সেচের অভাবে প্রতিবছরই পতিত থাকে অথবা সেখানে বোরো ধান আবাদ হয়। এসব জমিকে কাজে লাগাতে আমরা স্বল্প সময়ের ও স্বল্প সেচের ফসল হিসেবে গম চাষের পরিকল্পনা গ্রহণ করি। গত দুই বছরে প্রায় ১০৫ হেক্টর জমিতে গম আবাদ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি। আশা করছি আগামী বছর উপজেলায় প্রায় ৫০০ হেক্টর জমিতে গম আবাদ হবে, যা কৃষকদের আর্থিকভাবে লাভবান করবে।”কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান হোসেন বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মাঝে সবচেয়ে বেশি গম আবাদ হয় নবীনগর উপজেলায়। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা কৃষকদের সহায়তা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পার্টনার প্রকল্প, বি-স্ট্রং প্রকল্প, কুমিল্লা অঞ্চলের টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প এবং রবি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৩০০-এর বেশি কৃষকের মাঝে উন্নত জাতের গম বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সেচস্বল্প এলাকায় বিকল্প ফসল হিসেবে গম চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে অনাবাদি জমির ব্যবহার বাড়বে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকদের আয়ও বাড়বে। নবীনগরে গমের এই সম্প্রসারণ তাই ভবিষ্যতে কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
