নবচেতনা প্রতিবেদক : জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘরবাড়ি এবং জীবিকা হারিয়ে সাতক্ষীরায় আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর ৭৪ দশমিক ৯ শতাংশ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের ঘরে কোনো খাবার মজুত নেই। খাদ্য সংকটের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়েও চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি) ও পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রান) পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সাতক্ষীরা পৌরসভার ৩৫টি অনানুষ্ঠানিক বসতির ৩৫৮টি পরিবারের ১ হাজার ৩৪১ জন সদস্যের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, জরিপে অংশ নেওয়া ২৩ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার মাঝারি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। খাদ্য নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে এমন কোনো পরিবার পাওয়া যায়নি। খাবার জোগাড় করতে গিয়ে ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার উৎপাদনশীল সম্পদ বা প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রি করেছে। শিশুদের খাবারের ব্যবস্থা করতে গিয়ে ৯৫ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য নিজেরা কম খেয়েছেন।
খাদ্য সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার অর্থ সংকট এবং ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার খাদ্যের উচ্চমূল্যকে দায়ী করেছে। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের সুযোগও সীমিত। এসব পরিবারে সপ্তাহে গড়ে মাত্র ১ দশমিক ৯ দিন মাছ, মাংস বা ডিম, শূন্য দশমিক ৯ দিন দুধ এবং শূন্য দশমিক ৬ দিন ফল খাওয়ার সুযোগ হয়।
খাদ্য সংকটের পাশাপাশি নিরাপদ পানির অভাবও প্রকট হয়ে উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবার অন্তত আংশিকভাবে লবণাক্ত ও আয়রনযুক্ত অগভীর নলকূপের পানির ওপর নির্ভরশীল। মাত্র ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের খাবার পানির উৎস সব সময় পাওয়া যায়। এ ছাড়াও ৫০ শতাংশ পরিবারের অন্তত একজন সদস্য পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ আনুষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবা পাননি। গবেষণায় বাসস্থানের নিরাপত্তাহীনতার চিত্রও উঠে এসেছে। সরকারি জমিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে বসবাসকারী ৫৯ শতাংশ পরিবার উচ্ছেদ বা উচ্ছেদের হুমকির মুখে রয়েছে। গত এক বছরে ৭৭ দশমিক ১ শতাংশ পরিবারের ঘরে পানি উঠেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাস্তুচ্যুতির সময় ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার গবাদি পশু বা হাঁস-মুরগি, ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ খাদ্য মজুত, ৪১ দশমিক ১ শতাংশ কৃষিজমি এবং ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ মাছ ধরার সরঞ্জাম হারিয়েছে। এতে বাস্তুচ্যুতির আগের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। আর ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুতির পর পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য কমেছে।
সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে আছেন এসব মানুষ। মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার কোনো সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এক বছরে ৭৯ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহায়তা পায়নি।
গবেষণায় বাস্তুচ্যুতির আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শিক্ষা ও সামাজিক জীবনেও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিষয়টি উঠে এসেছে। ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সি শিশু-কিশোরদের ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ বিদ্যালয়ের বাইরে। ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের মধ্যে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে মাত্র ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ। বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশু-কিশোরদের ৩০ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ মূল্যায়নের বরাত দিয়ে গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বাংলাদেশে দুর্যোগের কারণে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ছিলেন। তাদের প্রায় ৬৩ শতাংশ ২০২০ সালের এপ্রিলের আগেই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অর্থাৎ বাস্তুচ্যুতি অনেকের জন্য সাময়িক সংকট নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা।
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনাতোলিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১। সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থানে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছে খানি ও প্রান। সংগঠন দুটি বলেছে, জলবায়ু বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি খাসজমিতে স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন, জরুরি খাদ্য সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
নবচেতনা/এআর
