নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর অপপ্রয়োগের আশঙ্কা প্রকাশ করে দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেছেন, গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা হবেই। তবে সরকারের সমালোচনা ও অপরাধের মধ্যে পার্থক্য করতে না পারলে বিপদ থেকেই যাবে। কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায়ে সংবাদমাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেওয়ার বিধান থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ নিয়ে মিডিয়া কমিটি ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন মতিউর রহমান চৌধুরী। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, আইন প্রণয়নের সময় শুধু বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলেই হবে না, ভবিষ্যতের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যারা আইন তৈরি করেছেন, পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনেককেই সেই আইনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাই আইন প্রণয়নের আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা জরুরি।
তিনি বলেন, “এই আইনটার প্রয়োজন আছে, আমি শুরুতেই বলেছি। সরকারের সমালোচনা আর অপরাধকে যদি আলাদা করা না যায়, তাহলে কিন্তু এই বিপদ থাকবে। সরকারের সমালোচনা হবেই। একটা গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা হবে।”
ব্যক্তির অপরাধে প্রতিষ্ঠান বন্ধ নয়
কোনো ব্যক্তির অপরাধের কারণে একটি সংবাদমাধ্যম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেওয়ার বিধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক। তিনি বলেন, একজনের অপরাধের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে না। সরকারের উদ্দেশ্যও এমন হওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, “পত্রিকা বন্ধ করে দেবেন আপনি, অনলাইন বন্ধ করে দেবেন। এটা একজন শরিফুল জনের জন্য তার রাজনৈতিক ডট কম বন্ধ হতে পারে না। আমার অপরাধের জন্য মানবজমিন বন্ধ হতে পারে না। ব্যক্তির জন্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেবেন, এটা তো সরকারের উদ্দেশ্য থাকার কথা না।”
সাইবার সন্ত্রাস ও অনলাইন অপরাধ মোকাবিলার গুরুত্ব স্বীকার করে তিনি বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপব্যবহার কীভাবে ঠেকানো হবে, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রস্তাবিত আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
স্থানীয় নেতার ফোনেই গ্রেপ্তারের আশঙ্কা
আইনের অপপ্রয়োগের আশঙ্কা তুলে ধরে মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, কাউকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি করতে সব সময় সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রীর ফোনের প্রয়োজন হবে না। স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতার ফোনেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, “আজকে আমরা বিএনপি, এই আইনের পরে হয়তো আরেক সরকার আসলো, তারা অন্য দলের সরকার আসলো, তারাও তো এর প্রয়োগ করবে। কাউকে এমপির ফোন পেতে হবে না। স্থানীয় নেতার টেলিফোনেই যথেষ্ট হয়ে যাবে আপনাকে ধরার জন্য।”
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, আগের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের (আইসিটি অ্যাক্ট) অধীনেও তিনি দুটি মামলার আসামি হয়েছিলেন। করোনাকালেও তাঁকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে। তাঁর মতে, যেকোনো সময় গ্রেপ্তারের আশঙ্কা থাকলে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে ভীতির পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
ভুল তথ্যের সংজ্ঞা স্পষ্ট করার তাগিদ
প্রস্তাবিত আইনে ভুল তথ্য ও ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য ছড়ানোর বিষয়গুলো কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, কোনো সংবাদ কারও পছন্দ না হলেই সেটিকে ভুল তথ্য হিসেবে চিহ্নিত করার আশঙ্কা রয়েছে। আবার কোনো সংবাদকে কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত বলেও দাবি করা হতে পারে।
কোনটি ভুল তথ্য, কোনটি ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হয়েছে এবং এসব নির্ধারণের দায়িত্ব কার—তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। যথাযথ সংজ্ঞা ও প্রক্রিয়া নিশ্চিত না হলে বিচার বা শাস্তির আগেই সাংবাদিকদের হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
মোবাইল কোর্টে সাংবাদিকের বিচার নিয়ে আপত্তি
সাংবাদিকদের বিচারের ক্ষমতা ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাতে দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানান মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, ভেজাল ওষুধসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। সেই আদালতের মাধ্যমে সাংবাদিকদের বিচার করার বিষয়টি গণতান্ত্রিক সমাজে কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, তা বিবেচনা করা দরকার।
তিনি বলেন, “আমি আশা করি, সরকার এই বিষয়টা একটু চিন্তা করবেন যে এই ক্লজটা অন্তত থাকবে না, যে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে একজন সাংবাদিকের বিচার করা। আপনি অপরাধ করতে পারেন, আইন আছে তো। আইনের কাছে সমর্পণ করেন। আলোচনা করেন।”
সাংবাদিক অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে তাঁর বিচার হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিচারপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
শুধু আইন করে দায়িত্বশীল করা যায় না
অনলাইন বুলিং ও ভুল তথ্য ছড়ানোর মতো সমস্যা মোকাবিলায় শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন মতিউর রহমান। তাঁর মতে, এ জন্য সামাজিক আন্দোলন, জনসচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আইন করে কাউকে দায়িত্বশীল করা যায় না।
প্রস্তাবিত আইন নিয়ে সরকারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ না করে তিনি সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যারা ক্ষমতায় থেকে আইন তৈরি করছেন, ভবিষ্যতে তাঁদেরও সেই আইনের প্রয়োগের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
জেলায় জেলায় আলোচনার আহ্বান
আইন প্রণয়নের আগে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করার আহ্বান জানান মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক। তিনি বলেন, আইন ছাড়া চলা সম্ভব নয়, তবে আইন তৈরির প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত থাকা জরুরি।
তিনি বলেন, “দয়া করে আমার হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে আগে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারবো না। আপনাকে একদিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।”
ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসা ব্যক্তিরাও অনেক সময় তাঁদের প্রতি অন্যায় হওয়ার অভিযোগ করেন। তাই শুধু বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে আইন তৈরি করা ঠিক হবে না।
মতিউর রহমান চৌধুরীর মতে, প্রস্তাবিত আইন নিয়ে জেলায় জেলায় আলোচনা করা উচিত এবং সমাজের সর্বস্তরের প্রতিনিধিদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। আইন সংশোধনের জন্য গঠিত কমিটিতেও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা দরকার।
তিনি বলেন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইন প্রয়োজন হলেও অপরাধ দমনের নামে যেন নতুন সংকট তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে দেশ, জাতি ও সরকার—সবাই উপকৃত হবে।
