ফরিদপুর প্রতিনিধি
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের কালিখোলা এলাকায় নির্মাণাধীন একটি সেতু প্রকল্পকে ঘিরে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা দেখা দিয়েছে। ‘খাল-নদী ছাড়াই ১২ কোটি টাকার সেতু’ শিরোনামে বিভিন্ন পোস্ট ও প্রতিবেদনে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল কর্মকর্তা ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি এবং প্রকল্পের প্রকৌশলগত যুক্তি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য উপস্থাপন না করায় জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গোয়ালন্দ-ফরিদপুর-তাড়াইল আঞ্চলিক মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কালিখোলা এলাকায় বর্তমানে ৪৪ মিটার দীর্ঘ এবং ১০ দশমিক ২৫ মিটার (প্রায় ৩৩.৬২ ফুট) প্রশস্ত একটি নতুন সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে নবারণ ট্রেডার্স লিমিটেড।
স্থানীয়ভাবে অনেকেই বর্তমানে সেখানে দৃশ্যমান কোনো নদী বা খাল না থাকায় সেতু নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তবে সংশ্লিষ্ট নথি ও স্থানীয় ইতিহাস বলছে, এলাকাটি একসময় ভুবনেশ্বর নদী থেকে উৎপন্ন গোপালপুর শাখা খালের গুরুত্বপূর্ণ প্রবাহপথ ছিল। ওই খালের ওপরই আগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্মিত প্রায় ৩৬ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু বিদ্যমান ছিল, যা দীর্ঘদিন ধরে যান চলাচলের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খালের দুই পাশে বসতবাড়ি, পুকুর, কৃষিজমি ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে ওঠায় এলাকাটির ভৌগোলিক চিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। অনেক স্থানে খালের দৃশ্যমানতা কমে গেলেও এর প্রাকৃতিক প্রবাহপথ পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। স্থানীয়দের দাবি এবং সরকারি বিভিন্ন জরিপের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে এটি গুরুত্বপূর্ণ জলপ্রবাহের অংশ ছিল। গুগল ম্যাপসহ বিভিন্ন স্যাটেলাইট চিত্রেও পুরোনো খালপথের অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ফরিদপুর সড়ক বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, প্রকল্পটি কোনোভাবেই নতুন করে ‘ডাঙার ওপর সেতু’ নির্মাণের উদাহরণ নয়। বরং পূর্ববর্তী ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকীর্ণ সেতুর পরিবর্তে আধুনিক মানসম্পন্ন নতুন সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “সেতুর নিচে ড্রেনেজ ওপেনিং কমানো হয়নি। ভবিষ্যতে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা কিংবা আকস্মিক বন্যার সময় যাতে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য পূর্বের প্রবাহপথ সংরক্ষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সড়ক বাঁধের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।”
প্রকৌশলগত ব্যাখ্যায় তিনি আরও বলেন, নতুন সেতুর দৈর্ঘ্য সামান্য বৃদ্ধি করা হয়েছে অ্যাবাটমেন্ট, উইং ওয়াল,পানি নিস্কাশন ড্রেন,সড়কের শোল্ডার সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার জন্য। অন্যদিকে প্রস্থ বাড়ানো হয়েছে ভবিষ্যৎ যানবাহন চলাচল, সড়ক সম্প্রসারণ এবং সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে।

সড়ক অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সেতু শুধু বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্মিত হয় না; বরং আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের সম্ভাব্য চাহিদা, জলপ্রবাহ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ কারণে কোনো স্থানে বর্তমানে দৃশ্যমান জলপ্রবাহ সীমিত থাকলেও প্রকৌশলগত বিশ্লেষণে ভবিষ্যৎ প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করিয়ে দেন যে, ফরিদপুর পদ্মা অববাহিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। অতীতে উজানের ঢল, অতিবৃষ্টি এবং ফারাক্কা ব্যারাজ সংশ্লিষ্ট পানি প্রবাহের কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঘটনা ঘটেছে। ফলে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে শুধু বর্তমান দৃশ্যমান অবস্থা নয়, সম্ভাব্য পানি প্রবাহ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অবশ্য প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, বর্তমানে জলপ্রবাহ কম থাকায় অপেক্ষাকৃত ছোট অবকাঠামো দিয়েও কাজ চালানো সম্ভব হতে পারত। তবে অবকাঠামো পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু বর্তমান দৃশ্যমান অবস্থার ভিত্তিতে কোনো প্রকল্পের কার্যকারিতা বিচার করা সব সময় সঠিক চিত্র তুলে ধরে না।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, কোনো সেতু প্রকল্প অনুমোদনের আগে একাধিক স্তরে কারিগরি যাচাই, নকশা মূল্যায়ন, ব্যয় বিশ্লেষণ এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। ফলে শুধুমাত্র স্থানীয় পর্যায়ের দৃশ্যমান অবস্থা নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল ও পরিকল্পনাগত তথ্যের ভিত্তিতেই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
এদিকে সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ঠিকাদার, প্রকৌশলী ও দপ্তর-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর মনিটরিং এবং সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অনেকেই তাকে সংকট মোকাবিলায় দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যদিও কাজের মান নিশ্চিত করতে তিনি তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন বলেও মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্টরা।
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে জনমতের গুরুত্ব রয়েছে এবং সমালোচনাও গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক অংশ। তবে কোনো প্রকল্প সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রকৌশলগত তথ্য, সরকারি নথি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বাস্তব পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ জরুরি।
তাদের ভাষ্য, কালিখোলা সেতু প্রকল্পকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে আলোচনা চলছে, তার অনেকাংশই আংশিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য শুধু বর্তমান যোগাযোগ সুবিধা বৃদ্ধি নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ সড়ক যোগাযোগ, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং এলাকার টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
বর্তমানে সেতুটির নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। কাজ শেষ হলে গোয়ালন্দ-তাড়াইল আঞ্চলিক সড়কে যান চলাচল আরও নিরাপদ ও গতিশীল হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনাতেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন প্রকৌশল বিশেষজ্ঞরা।

