ঢাকার আশপাশের শহরতলি এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশকে ২০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এ অর্থের মাধ্যমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, দক্ষতা ও দুর্যোগসহনশীলতা বাড়ানো হবে।
‘বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ঢাকার আশপাশের দ্রুত সম্প্রসারিত শিল্প ও শহরাঞ্চলে সেবা দেওয়া ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পিবিএস) বিতরণ অবকাঠামো উন্নত করবে। অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত সাবস্টেশন, পুরোনো অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রকল্পটি সহায়তা করবে।
এ প্রকল্পের আওতায় ৫২টি সাবস্টেশনে মোট ১ হাজার ১৫০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার নতুন ট্রান্সফরমার সক্ষমতা স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান ১২টি সাবস্টেশনের সক্ষমতা ১১৫ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার বাড়ানো হবে। এছাড়া ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের বেশি ওভারহেড ও ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন নির্মাণ বা উন্নয়ন করা হবে। নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা, দক্ষতা ও নিরাপত্তা বাড়াতে ইনসুলেটেড কন্ডাক্টরও স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের আওতায় নদী পারাপারের বিদ্যুৎ সঞ্চালন কাঠামো ও সুইচিং স্টেশন নির্মাণের পাশাপাশি দ্রুত ত্রুটি শনাক্ত ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারে ৯০০টি ফল্ট লোকেটর সেট স্থাপন করা হবে। এতে বিতরণ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম আরও আধুনিক ও দক্ষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এডিবির বাংলাদেশে কান্ট্রি ডিরেক্টর কিংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য আধুনিক বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী অবকাঠামো ও দুর্যোগসহনশীল ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রকল্পটি ঢাকার আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধি করিডোরগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতের চাহিদা মোকাবেলায় সক্ষম করে তুলতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশ ২০২২ সালে সার্বজনীন বিদ্যুতায়ন অর্জন করলেও দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। ফলে বিতরণ নেটওয়ার্কের ওপরও চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে বাড়তি চাহিদা পূরণে বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা জোরদার করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগসহনশীল ও নিম্ন-কার্বন উন্নয়ন লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন বাড়ানো হবে।
প্রকল্পটির জন্য এডিবির নির্দিষ্ট দুর্যোগসহনশীলতা অর্থায়নের পরিমাণ ১৪ কোটি ৬৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। এর আওতায় পরিবেশবান্ধব গ্যাস-ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার প্রযুক্তির মতো অভিযোজনমূলক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা দেওয়া হবে। উন্নত বিতরণ দক্ষতা ও কারিগরি ক্ষতি কমানোর মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার ৭৫১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
এ ছাড়া বিআরইবি ও পিবিএসগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে। ডিজিটাল সিস্টেম একীভূতকরণ, সাইবার নিরাপত্তা, দুর্যোগসহনশীল পরিচালনা ব্যবস্থা, পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
পিবিএসগুলোর আর্থিক স্থায়িত্ব জোরদারের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগও তৈরি করা হবে। পাশাপাশি নারী ও মেয়েদের প্রয়োজনের প্রতি সংবেদনশীল বিভিন্ন কার্যক্রম থাকবে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এডিবির ঋণের পাশাপাশি প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ সরকার ১০ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার এবং বিআরইবি ১৪ কোটি ১৩ লাখ ৯০ হাজার ডলার অর্থায়ন করবে। এডিবির ব্যবস্থাপনায় কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের ই-এশিয়া অ্যান্ড নলেজ পার্টনারশিপ ফান্ড থেকে ১০ লাখ ডলারের কারিগরি সহায়তা অনুদানও দেওয়া হবে। এ অর্থ প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন, আর্থিক স্থায়িত্ব পরিকল্পনা এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হবে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দুর্যোগসহনশীল প্রবৃদ্ধিতে সহায়তাকারী বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক। ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটির মালিকানা ৬৯টি সদস্য দেশের হাতে, যার মধ্যে ৫০টি এশিয়া অঞ্চলের।
