ePaper

ডিবি হেফাজতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা প্রান্ত মির্জার মৃত্যু: নির্যাতনের অভিযোগ পরিবারের,  পুলিশ বলছে—‘ব্রেন স্ট্রোক’; তদন্তের দাবিতে উত্তাল মধুখালী

ব্যুরো চীফ, ফরিদপুর

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার ছাত্রলীগ নেতা মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত (৩০) জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হেফাজতে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার ঘটনায় জেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ তোলা হলেও পুলিশ বলছে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত জটিলতায় তার মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্য, স্থানীয় সুধীজন ও এলাকাবাসী।

নিহত প্রান্ত মধুখালী পৌরসভার গোন্দারদিয়া গ্রামের মরহুম মির্জা এসকেন্দার হায়দারের ছেলে। তিনি মধুখালী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মির্জা মনিরুজ্জামান বাচ্চুর ভাতিজা এবং আইন বিষয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে।পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শনিবার (২০ জুন) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ডিবি পুলিশ প্রান্তকে আটক করে বলে পরিবারের দাবি। তবে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে মধুখালী পৌরসভার গোন্দারদিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ আটক করা হয়। একই অভিযানে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে মধুখালী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ আলমগীর হোসেন জানান, আইনগত প্রক্রিয়া শেষে প্রান্তকে জেলা গোয়েন্দা কার্যালয়ে আনা হয়। সেখানে তিনি নাস্তা করেন এবং ফজরের নামাজ আদায় করেন। পরে হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলে তাকে প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তার মৃত্যু হয়।ওসি আলমগীর হোসেনের দাবি, চিকিৎসকদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ এবং ইসিজি ও সিটি স্ক্যান পরীক্ষায় মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের বিষয়টি ধরা পড়েছে। তিনি বলেন, “কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়। আমরা আইন অনুযায়ী যা করার প্রয়োজন ছিল, তা করেছি।”ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, “আটকের পর ভোরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের জন্য মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে।” তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিকভাবে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে কোনো ধরনের শারীরিক আঘাত করা হয়নি।”তবে পুলিশের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে নিহতের পরিবার। প্রান্তের মেজ চাচী নাসরিন জামান অভিযোগ করে বলেন, “ডিবি পুলিশ পুরো বাড়ি তল্লাশি করেও কিছু পায়নি। আমরা অনুরোধ করেছিলাম, কিছু না পেলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হোক। কিন্তু তারা কথা রাখেনি। আমার ভাতিজা ছিল পরিবারের রত্ন। আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছিল। তার মৃত্যুর সঙ্গে পরিবারের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। আমরা বিশ্বাস করি, তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”নিহতের চাচা ও মধুখালী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মির্জা আবু জাফর বলেন, “গতকাল তাকে আটক করা হয়। সকালে জানতে পারি, সে হাসপাতালে মারা গেছে। আমরা ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে চাই।”

এদিকে, প্রান্তের বিরুদ্ধে পূর্বে একটি মাদক মামলা ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, তাকে বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং আটকের পর কী ঘটেছিল সে বিষয়ে তারা স্পষ্ট কোনো তথ্য পাননি।ঘটনার পর মধুখালী এলাকায় শোকের পাশাপাশি ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, যেহেতু ঘটনাটি পুলিশ হেফাজতে থাকা একজন ব্যক্তির মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, চিকিৎসকদের আনুষ্ঠানিক মতামত এবং প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তারা বলছেন, তদন্তে যদি কোনো ধরনের অবহেলা বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। ফলে প্রান্ত মির্জার মৃত্যু স্বাভাবিক নাকি হেফাজতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ফল—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। আর সেই উত্তর খুঁজতেই তাকিয়ে আছে নিহতের পরিবার, এলাকাবাসী এবং সংশ্লিষ্ট মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *