নীলফামারীতে ৮৯০ পূজামণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

 হামিদুল্লাহ সরকার

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে নীলফামারীর ছয় উপজেলায় এখন উৎসবের আনন্দ আর ব্যস্ততার জোয়ার বইছে। প্রতিটি মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের নিখুঁত প্রস্তুতি। দেবী দুর্গাসহ অন্য সব প্রতিমাকে চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যে সাজিয়ে তুলতে দিন-রাত এক করে ঘাম ঝরাচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা। কারিগরের শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় খড়, বাঁশ ও মাটির মণ্ড এক একটি নিখুঁত ও জীবন্ত প্রতিমায় রূপান্তরিত হচ্ছে।?জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ ও পূজা উদযাপন ফ্রন্ট সূত্রে জানা গেছে, এ বছর নীলফামারী জেলার ছয়টি উপজেলায় সর্বমোট ৮৯০টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশ কয়েকটি বেশি। পূজা যত এগিয়ে আসছে, মণ্ডপ প্রাঙ্গণগুলোতে ব্যস্ততা ততই বাড়ছে কোথাও চলছে মাটির শেষ পরশের কাজ, কোথাও আবার রং, অলংকার, মুকুট ও নতুন পোশাকে প্রতিমা সাজানোর চোখধাঁধানো সাজসজ্জা। উৎসবের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, মণ্ডপ কর্মকর্তা, প্রতিমাশিল্পী এবং সাধারণ ভক্তদের উৎসাহ-উদ্দীপনা ততই চরম মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে। মণ্ডপ ডেকোরেশন, আধুনিক আলোকসজ্জা ও দৃষ্টিনন্দন প্যান্ডেল নির্মাণের কাজও চলছে সমানতালে।?প্রতিমা গড়ার অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে নীলফামারী সদর উপজেলার মিলন পল্লী সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের প্রতিমাশিল্পী শ্যামল পাল বলেন, এ বছর আমি ৩টি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ হাতে নিয়েছি। নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করতে দিনরাত পরিশ্রম করছি। আমাদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেলেও মণ্ডপগুলোর কাছ থেকে সেই অনুপাতে দাম পাচ্ছি না। তবুও এটি শুধু জীবিকা নয়, মায়ের প্রতিমা গড়ার আলাদা এক অনুভূতি ও তৃপ্তি রয়েছে; তাই শত ক্লান্তি এলেও কাজ থামাই না।”মিলনপল্লী মন্দিরের সাধারন সম্পাদক শ্রী প্রদীপ কুমার দাস বলেন ?”শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আমাদের সম্প্রীতি, মিলন ও সার্বজনীন আনন্দের প্রতীক। মিলনপল্লী মন্দিরে প্রতিবারের মতো এবারও অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দমুখর পরিবেশে মা দুর্গার পূজা উদযাপিত হচ্ছে। আমরা সর্বস্তরের ভক্ত ও সুধীজনকে মিলনপল্লী মন্দিরে আসার সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।নীলফামারী সদর উপজেলার ?ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী আনন্দময়ী কালীমাতা মন্দিরের প্রতিমাশিল্পী সদানন্দ পাল ভাবাবেগে আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, মা দুর্গার রূপ অন্তরে ধারণ করে যখন প্রতিমা তৈরিতে হাত দিই, তখন পৃথিবীর সব ক্লান্তি ও কষ্ট ভুলে যাই। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একটানা কাজ করলেও মনে এক অলৌকিক আনন্দ কাজ করে। কারণ এটি সাধারণ কোনো মাটির কাজ নয়, এটি আমাদের ভক্তি ও আরাধনার পরম রূপ।?একই মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক তাপস সাহা এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক ঝন্টু ভৌমিক বলেন,শারদীয় দুর্গাপূজা মানেই সম্প্রীতি ও সর্বজনীন আনন্দের মিলনমেলা। আমাদের মন্দিরের মূর্তির মাটির কাজ শেষ হয়ে এখন ঝকঝকে সাজসজ্জার কাজ চলছে। সরকারের সকল সামাজিক ও স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত বিধিমালা মেনে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্দেশনা অনুসরণ করে আমরা একটি সুশৃঙ্খল উৎসব উপহার দিতে চাই। অতীতের মতো এবারও সম্প্রীতির আবহ বজায় রেখে নীলফামারীর সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ দেশের সর্বস্তরের মানুষকে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

?মৃৎশিল্পের বর্তমান সংকট তুলে ধরে ডোমার উপজেলার জ্যেষ্ঠ কারিগর কালিপদ পাল বলেন,দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আমি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাঁশ, খড়, রং ও মাটির দাম যেভাবে হু-হু করে বেড়েছে, তাতে এই পেশায় টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। আগের মতো আর লাভ থাকে না, তবুও এটি আমাদের পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী পেশা। এই শিল্প ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্যে আমরা এই কাজ ভালোবেসে আঁকড়ে ধরে আছি।?আয়োজন ও নীতিগত নির্দেশনার বিষয়ে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ ও পূজা উদযাপন ফ্রন্ট-এর নেতৃবৃন্দরা জানান,স্থানীয় প্রবীণ ও নবীনদের সমন্বয়ে প্রতিটি মণ্ডপে শান্তিপূর্ণ আয়োজনের সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। পূজার পবিত্রতা বজায় রাখতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে মণ্ডপগুলোতে ধর্মীয় রীতিনীতি ও ভাবগাম্ভীর্যের বাইরে কোনো ধরনের অপসংস্কৃতি, অনাকাঙ্ক্ষিত নাচ-গান কিংবা উচ্চশব্দে আধুনিক বাজনা বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সরকারি অনুদানের পাশাপাশি স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা আমাদের আশান্বিত করেছে। আশা করছি, নীলফামারীতে এবারও সম্প্রীতি ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে।?জেলায় পূজার সার্বিক নিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলা বিষয়ে নীলফামারীর পুলিশ সুপার ফরহাদ খান, পিপিএম দৃঢ় আশ্বাস দিয়ে বলেন, জেলার ৮৯০টি পূজামণ্ডপেই ভক্তরা যাতে অত্যন্ত আনন্দময়, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশে পূজা উদযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে জেলা পুলিশ সব ধরনের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে সব উপজেলার পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি এবং ইউপি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে নিয়ে সমন্বয় সভা করা হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে আনসার ও পুলিশের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক টিম মোতায়েন থাকবে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে।