ePaper

জাতিসংঘে তারেক রহমান: মারণাস্ত্র নয়, বিশ্বশান্তির হাতিয়ার হোক কূটনীতি

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আলোচনা, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে সংঘাত ও যুদ্ধের পরিবর্তে যুক্তি, সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি সমঝোতামূলক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় দেওয়া প্রায় ২১ মিনিটের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ভাষণে তিনি বিশ্বশান্তি, নিরস্ত্রীকরণ, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো আন্তর্জাতিক বিরোধ ও সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় ও মানবিক বিশ্ব, যেখানে মারণাস্ত্র নয়, বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা।” সমঝোতাভিত্তিক বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিশ্বব্যাপী চলমান সংঘাতের প্রভাব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ ও অস্থিরতার কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি চাপে পড়ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট সামরিক খাতে স্থানান্তরের প্রবণতা বিশ্বশান্তির জন্য উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটি পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পাশাপাশি ফিলিস্তিনের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।

ভাষণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে তরুণরা তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে এবং শিশুরা তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে। নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলেও তিনি জানান।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ব্যবসাবান্ধব ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময়ের স্বৈরশাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে সরকার ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’ বা ‘থ্রি-আর’ কৌশল অনুসরণ করছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে উৎপাদনকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথাও তিনি তুলে ধরেন।

এ ছাড়া তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের সহায়তায় চলতি অর্থবছরে ৫ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখার তথ্য জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতা কামনা করেন।

ভাষণের শুরুতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের সংগ্রামে আত্মত্যাগকারী ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ করেন। বক্তব্যের শেষেও তিনি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বিশ্ব গঠনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান জানান।