ePaper

বগুড়া পারলে ফরিদপুর নয় কেন—সাত বছর পর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ

ফরিদপুর ব্যুরো

সাত বছর ধরে ঝুলে থাকা ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া আবারও গতি পাচ্ছে। এবার সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ৩০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগকে দেওয়া এক চিঠিতে ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয়তার নিরিখে পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এ বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে।

এর আগে ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। আবেদনে তিনি বলেন, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং নাগরিক সেবার চাহিদা বাড়ায় বর্তমান পৌরসভা কাঠামোর মাধ্যমে ফরিদপুরে আধুনিক নগরসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সর্বশেষ নির্দেশকে অবশ্য সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রশাসনিক পর্যালোচনা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মতামত, প্রয়োজনীয় প্রস্তাব প্রণয়ন এবং বিধি অনুযায়ী পরবর্তী অনুমোদনের ধাপ পেরিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। ফলে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হলেও এখনই ফরিদপুরকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হয়েছে—এমনটি বলার সুযোগ নেই। সাত বছর আগেই নিকার অনুমোদন ফরিদপুরকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৮ সালে এ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়। সে সময় সিটি করপোরেশন গঠনের লক্ষ্যে পৌরসভার আয়তন ১৭ দশমিক ৩৮ বর্গকিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৬৬ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার করা হয়। ওয়ার্ডের সংখ্যাও ৯ থেকে বাড়িয়ে ২৭ করা হয়। ২০১৮ সালের প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রস্তাবিত এলাকার সীমানা সম্প্রসারণ ও ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়।

তৎকালীন প্রশাসনিক যাচাই ও প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন মানদণ্ডও ফরিদপুর পূরণ করেছিল। প্রস্তাবিত এলাকায় জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার, স্থানীয় আয়ের উৎস ২০ কোটি টাকার বেশি এবং পৌরসভার বার্ষিক আয় প্রায় ৫১ কোটি টাকা ছিল বলে সে সময়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতিও ছিল উল্লেখযোগ্য।

এরপর আসে ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর। ওই দিন প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১১৬তম সভায় ফরিদপুরকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার প্রস্তাব শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হয়। শর্ত ছিল—ফরিদপুর বিভাগীয় শহর হলে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম শুরু হবে। এ সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ফরিদপুরে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দিলেও বাস্তবে সিটি করপোরেশনের যাত্রা শুরু হয়নি।

ফলে নিকার অনুমোদনের পরও সাত বছর ধরে ফরিদপুর পৌরসভা হিসেবেই রয়ে গেছে।

‘বিভাগ হলে সিটি’—শর্তেই থেমে যায় প্রক্রিয়া ২০১৯ সালের সিদ্ধান্তের পর মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায় ‘বিভাগীয় শহর’ হওয়ার শর্ত। ফরিদপুর বিভাগীয় শহর না হওয়ায় সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কার্যক্রমও আর এগোয়নি। ফরিদপুর পৌরসভার নিজস্ব ওয়েবসাইটেও ২০১৯ সালের নিকার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ফরিদপুর বিভাগ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সিটি করপোরেশনের মর্যাদা পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এদিকে ২০২৬ সালের একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬৬ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার আয়তন ও প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার মানুষের জন্য ফরিদপুর পৌরসভা বর্তমানে নাগরিক সেবা দিতে গিয়ে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে। সড়ক, জলাবদ্ধতা, মশকনিধন, পানি সরবরাহ, সড়কবাতি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমস্যা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সিটি করপোরেশন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ‘বিভাগ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে কার্যকর হবে’ শর্তের কারণে স্থগিত হয়ে যায়।

বগুড়ার দৃষ্টান্তে নতুন প্রশ্ন

ফরিদপুরের দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে চলতি বছর বগুড়াকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ বগুড়াও বিভাগীয় সদর নয়। তারপরও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে ৭ মে নিকারের ১২০তম সভায় বগুড়া সিটি করপোরেশন গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়।

বগুড়ার এ সিদ্ধান্তের পর ফরিদপুরের মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—২০১৯ সালে বিভাগীয় শহর হওয়ার শর্তে ফরিদপুরের সিটি করপোরেশন কার্যকর করা সম্ভব হয়নি, অথচ বিভাগীয় সদর না হয়েও বগুড়া কীভাবে সিটি করপোরেশনের মর্যাদা পেল?

এই প্রশ্নই এখন ফরিদপুরের সিটি করপোরেশন বাস্তবায়নের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।আয়তন-জনসংখ্যা বেড়েছে, কাঠামো বাড়েনি ফরিদপুর পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের পর শহরের পরিধি অনেক বেড়েছে। ৬৬ দশমিক ৫৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার মানুষের বসবাস। অথচ প্রশাসনিক কাঠামো এখনো পৌরসভাকেন্দ্রিক। ফলে বড় এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য পৌরসভার বিদ্যমান কাঠামো ও সক্ষমতা যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরিদপুর পৌরসভার সম্প্রসারণের পরও সিটি করপোরেশনের কাঠামো ও অর্থায়ন না থাকায় নাগরিক সেবা প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। বিশেষ করে সড়ক ও ড্রেনেজ, জলাবদ্ধতা, মশকনিধন, পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো সেবায় সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। ফলে সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার দাবি এখন শুধু প্রশাসনিক মর্যাদার প্রশ্ন নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবার সক্ষমতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।

নতুন করে জোরালো হচ্ছে দাবি ২০২৬ সালে এসে ফরিদপুর বিভাগ ও সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে। ১৭ এপ্রিল ফরিদপুরে আঞ্চলিক উন্নয়নবিষয়ক মতবিনিময় সভায় ফরিদপুর বিভাগ ও সিটি করপোরেশন বাস্তবায়নের দাবি ওঠে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের কর্মকর্তারাও এ দাবির পক্ষে মত দেন বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৃথক আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, পৌরসভার আয়তন ও ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়লেও নাগরিক সেবা ও অবকাঠামো সেই অনুপাতে উন্নত হয়নি। সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হলে পরিকল্পিত নগরায়ণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এবার সম্ভাব্যতা যাচাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সর্বশেষ নির্দেশের পর এখন মূল দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বিভাগের ওপর। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তা, আর্থিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা, সীমানা, ওয়ার্ড কাঠামো, সম্পদ, জনবল এবং নাগরিক সেবার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হবে।

এরপর প্রয়োজনীয় মতামত ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর সরকারি গেজেট এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়েই সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠা কার্যকর হবে। অর্থাৎ সাত বছর আগের নিকার অনুমোদনের পর এবার নতুন করে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দরজা খুলেছে। নামের মর্যাদার চেয়ে বড় নাগরিক সেবা

ফরিদপুরবাসীর প্রত্যাশা, সিটি করপোরেশন হলে সেটি যেন শুধু নাম পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, আধুনিক নগর পরিকল্পনা, উন্নত সড়ক ও ড্রেনেজ, পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর কাঠামোও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ পৌরসভার আয়তন ও জনসংখ্যা বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে সেই অনুপাতে নাগরিক সুবিধা বাড়েনি।

এবার কি কাটবে সাত বছরের জট? ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর নিকার অনুমোদন, এরপর বিভাগীয় শহর হওয়ার শর্তে দীর্ঘ স্থবিরতা—সব মিলিয়ে ফরিদপুরের সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সাত বছর ধরে অপেক্ষমাণ। এর মধ্যে বগুড়া বিভাগীয় সদর না হয়েও সিটি করপোরেশনের মর্যাদা পাওয়ায় ফরিদপুরের পুরোনো প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে।

এখন ৩০ আগস্টের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ সেই আটকে থাকা প্রক্রিয়াকে নতুন করে প্রশাসনিক আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসেছে। তবে সামনে এখনও একাধিক ধাপ রয়েছে। ফলে উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠায় গড়ায় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সাত বছর আগে নিকার অনুমোদন পেয়েও যে ফরিদপুর সিটি করপোরেশন বাস্তবায়িত হয়নি, এবার সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই অপেক্ষার অবসান হয় কি না—সেদিকেই তাকিয়ে ফরিদপুরের কয়েক লাখ নাগরিক।