ePaper

ভোক্তা অধিদপ্তরের চাইতেও শক্তিশালী মোবাইল অপারেটর

আশরাফ আলী হাওলাদার

গতকাল  রোববার বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে সকাল ১০ঃ৩০ মিনিটে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে একটি র‌্যালী অনুষ্ঠিত হয়। র‌্যালিটি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গিয়ে শেষ হয়। পরবর্তীতে ক্যাবের কার্যালয়ে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ক্যাবের প্রেসিডেন্ট এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, আমি যখন ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলাম তখন গ্রাহকের অভিযোগ নিয়ে অনেক মামলা করেছিলাম কিন্তু পরবর্তীতে মোবাইল অপারেটররা মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে সকল কার্যক্রম বন্ধ করা দেয়। গ্রাহকের কেনা ডাটা প্যাকেজ নিয়ে যেভাবে গ্রাহকের অর্থ হরণ করা হয় তা নজীর বিহীন। ডিজিটাল জীবনযাত্রা আমাদেরকে শুধু কাজকর্ম সহজ করে দেয়নি আমাদেরকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছে। যেখানে সকল নাগরিকের উপর নজরদারি করা যায় সেখানে জুয়া কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। তিনি আরো বলেন ১৮০ টাকার মধ্যে ১০০ টাকা সরকার ভ্যাট আদায় করে কিন্তু এই ভ্যাটের অর্থ সরকার এবং কমিশন কোথায় ব্যয় করে তা জানার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সাবেক পরিচালক খালিদ এবং নাছের বলেন, টেলিকম সেক্টরে প্রতিযোগিতার আইনের কোন ব্যবহার হচ্ছে না। একমাত্র গ্রামীণফোন কে যেভাবে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে তাতে করে রাষ্ট্রীয় অপারেটরের পাশে আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খুব দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি জুলাইয়ে আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধের বিরুদ্ধে ক্যাব এবং মুঠোফোন গ্রাহককে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অনুরোধ জানান।

সিপিবির কেন্দ্রীয় সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহীন হোসেন প্রিন্স বলেন, প্যাকেজ এর নামে নৈরাজ্য করতে দেয়া চলবে না। সরকারকে ৫৬ শতাংশ ভ্যাট আদায় করতে দেয়া উচিত হবে না। সাইবার সিকিউরিটি এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিষয় সরকারকে যত্ন বান হতে আহ্বান জানান। বাসদের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, আমরা ডিজিটাল উন্নতির কথা বলি অথচ আমরা নিজেরা উন্নত হতে চাই না। আমরা যদি প্রযুক্তির বান্ধব শ্রমিক বিদেশে পাঠাতে পারে তাহলে বাংলাদেশ আরও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। এ আই আমাদেরকে যতটা না সুবিধা দিচ্ছে তার চাইতে বেশি করে ভাবিয়ে তুলছে।

আরো বক্তব্য রাখেন, জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম এর ভাইস প্রেসিডেন্ট সামিউল ইসলাম, বাংলাদেশ মোবাইল ফোন রিচার্জ ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমনুল ইসলাম বুলু, সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট সাহিদা বেগম, কেন্দ্রীয় সদস্য মাহফুজ প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আজ আমরা এমন এক গুরুত্বপূর্ণ দিবস উপলক্ষে একত্রিত হয়েছি, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত—বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্যসংঘ দিবস। বর্তমান বিশ্বে টেলিযোগাযোগ আর বিলাসিতা নয়, এটি এখন একটি মৌলিক অধিকার ও “ডিজিটাল লাইফলাইন”। একটি সংযুক্ত, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ গত এক দশকে টেলিযোগাযোগ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবার বিস্তার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে। তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। সেবার মানের বৈষম্য, উচ্চমূল্যের ইন্টারনেট প্যাকেজ, গ্রাহক হয়রানি ও স্বচ্ছতার অভাব, দুর্বল অবকাঠামো, জরুরি পরিস্থিতিতে নেটওয়ার্ক অস্থিতিশীলতা। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—ডিজিটাল সংযোগকে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই করা। “ডিজিটাল লাইফলাইন” বলতে বোঝায় একটি নিরবচ্ছিন্ন, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা দুর্যোগের সময় মানুষকে সংযুক্ত রাখে স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেয়, শিক্ষা ও তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করে, অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখে, কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের দেখিয়েছে ডিজিটাল সংযোগ ছাড়া সমাজ কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে এখনও অনেক গ্রাহক নিম্নোক্ত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন

১. নেটওয়ার্ক মানের অবনতি: গ্রামীণ এলাকায় দুর্বল সিগন্যাল ও ধীরগতির ইন্টারনেট ২. মূল্য বৈষম্য: একই সেবার জন্য ভিন্ন ভিন্ন মূল্য নির্ধারণ ৩. অযৌক্তিক চার্জ ও প্যাকেজ জটিলতা ৪. গ্রাহক অধিকার লঙ্ঘন: অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নেই ৫. দুর্যোগে নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়া: ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার সময় টাওয়ার ধসে পড়া,  গ্রাহক অধিকার ও ন্যায্যতা।  বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন বরাবরই গ্রাহকের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার।

আমরা বিশ্বাস করি সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত সেবা পাওয়া গ্রাহকের অধিকার, স্বচ্ছ বিলিং ও স্পষ্ট প্যাকেজ তথ্য নিশ্চিত করতে হবে, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, ডাটা প্রাইভেসি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

করণীয় ও সুপারিশ: ১. নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে, গ্রাহকবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। ২. অবকাঠামো উন্নয়ন: শক্তিশালী মোবাইল টাওয়ার, দুর্যোগ সহনশীল নেটওয়ার্ক, ফাইবার অপটিক সম্প্রসারণ, ৩. মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা: যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ, লুকানো চার্জ বন্ধ, সহজবোধ্য প্যাকেজ ৪. গ্রাহক সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন: দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি, জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা, ৫. ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি: গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা, শিক্ষার্থী ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট ৬. জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা: দুর্যোগে বিকল্প নেটওয়ার্ক, জরুরি সেবা অগ্রাধিকার, ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি: স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে একটি শক্তিশালী, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা অপরিহার্য। আমাদের লক্ষ্য হতে হবেÑ “প্রত্যেক নাগরিকের জন্য মানসম্মত ডিজিটাল সংযোগ নিশ্চিত করা”

আজকের এই দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞা করি গ্রাহকের অধিকার রক্ষায়, ন্যায্য সেবা নিশ্চিত করতে এবং একটি টেকসই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা একসাথে কাজ করবো। ডিজিটাল সংযোগ কেবল প্রযুক্তি নয় এটি মানুষের জীবনরেখা। এই জীবনরেখাকে শক্তিশালী করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *