শেখ হাসান গফুর, সাতক্ষীরা:
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের উদ্যোগে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলায় বাস্তবায়নাধীন “পোল্ডার নং-১৪/১ পুনর্বাসন” প্রকল্পটি ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রায় ১১৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত এই প্রকল্পটি ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর একনেক সভায় অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো পোল্ডারের বাঁধ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং লবণাক্ততা দূরীকরণ নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং জনজীবনে স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নদীর মরফোলজিক্যাল পরিবর্তনের কারণে অনুমোদিত ডিজাইন প্রাপ্তিতে প্রায় দেড় বছর বিলম্ব হওয়ায় টেন্ডার প্রক্রিয়াও পিছিয়ে যায়। ফলে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত প্রকল্প মেয়াদে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে বাস্তবতার প্রেক্ষিতে প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফা বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির অধীনে মোট ৪৮টি প্যাকেজে কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বিভাগ-২ বাস্তবায়ন করছে ২৫টি এবং খুলনা পানি উন্নয়ন বিভাগ-২ বাস্তবায়ন করছে ২৩টি প্যাকেজ। সার্বিক অগ্রগতি ইতোমধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশে পৌঁছেছে এবং কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ৯২.৯৩ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে এবং ডিএলএসি সভাও সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে চার ধারা নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, খুব শিগগিরই জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পোল্ডার ১৪/১ এর প্রায় ৩০.২০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ স্থায়ী সুরক্ষার আওতায় আসবে। এর ফলে কয়রা উপজেলার প্রায় ২৯৩৩ হেক্টর এলাকা সরাসরি উপকৃত হবে। একই সঙ্গে পোল্ডারের অভ্যন্তরীণ খালগুলোতে মিঠা পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, যা কৃষি জমিতে সেচ প্রদান এবং গৃহস্থালী কাজে ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা হ্রাসের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। উন্নত হবে যোগাযোগ ব্যবস্থা, সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য বিমোচনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন, জোয়ার-ভাটা, ঝড়ো হাওয়া ও মৌসুমি নিম্নচাপের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে পোল্ডারের অভ্যন্তরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সবমিলিয়ে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ এই অঞ্চলে পোল্ডার ১৪/১ পুনর্বাসন প্রকল্পটি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, পোল্ডার ১৪/১ কয়রাবাসীর জন্য দীর্ঘদিনের একটি প্রত্যাশিত প্রকল্প। নদীভাঙন ও লবণাক্ততার ঝুঁকি মোকাবেলায় বাঁধের স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। ইতোমধ্যে ৪৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং ২৫টি প্যাকেজে দৃশ্যমান অগ্রগতি রয়েছে। আমরা গুণগতমান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে বদ্ধপরিকর। কাজের অগ্রগতির বিষয়ে পোল্ডার নং-১৪/১ পুনর্বাসন প্রকল্পের পরিচালক ড. মোঃ আবুল বাসার বলেন, “শুরুতে ডিজাইন জটিলতা ও প্রাকৃতিক কিছু চ্যালেঞ্জের কারণে কাজ কিছুটা বিলম্বিত হলেও এখন আমরা পুরোদমে এগিয়ে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে ৪৮% কাজ শেষ হয়েছে এবং সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২৫টি প্যাকেজে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের কাজও দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। আমরা আশাবাদী, নির্ধারিত সময় ২০২৭ সালের মধ্যেই প্রকল্পের শতভাগ কাজ সম্পন্ন করে কয়রাবাসীর হাতে এর সুফল তুলে দিতে পারব। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বন্যা ও লবণাক্ততার ঝুঁকি কমার পাশাপাশি সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি কৃষি উৎপাদন ও স্থানীয় মানুষের জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
