ePaper

সিরাজগঞ্জে ৫৫ বছর ধরে বেয়নেটের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন আবু বক্কার

রফিকুল ইসলাম,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। কৃষক থেকে বুদ্ধিজীবী কেউ রেহাই পায়নি পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরদের পৈশাচিকতা থেকে। সেই ভয়াবহ স্মৃতি আর পঙ্গুত্বের ক্ষত নিয়ে আজও অনেকে বেঁচে আছেন মুক্তিসংগ্রামের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে। তেমনই একজন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কোনাগাঁতী গ্রামের সাধারণ তাঁত শ্রমিক আবু বক্কার খান। পাক বাহিনীর পৈশাচিক হামলার শিকার গয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে বেয়নেটের ক্ষতচিহ্ন আর গণহত্যার দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। ৫৫ বছর ধরে ক্ষতের স্থানে তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছেন তিনি। তবে দুঃখের বিষয়, এত বছরেও সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহযোগিতা তিনি পাননি। কোনাগাঁতী গ্রামের মৃত শুক্কুর আলী খানের ছেলে আবু বক্কার খান বর্তমানে শয্যাশায়ী। জীর্ণ টিনের ঘরে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন তিনি। একা একা চলতে পারেন না। স্ত্রীর সাহায্যে ঘর থেকে বের হতে পারেন।

একাত্তরে তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া পাক বাহিনীর বর্বরতার বিষয়ে জানতে চাইলে ফোকলা দাঁতে ভাঙা গলায় তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়। দেশে তখন পুরো যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে, গ্রামে গ্রামে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সামনে মানুষ পেলেই গুলি করে মারছে। কেউ দৌড়ে পালিয়ে বাঁচতে পারছে। আবার কেউ গুলি খেয়ে মাটিতে ঢলে পড়ছে। গ্রামে আর্মিদের এসব ভয়ংকর অত্যাচার দেখে আমরা দূরে চলে গিয়েছি। কোনাগাঁতী ব্রিজের নীচে আমরা তিনজন পালিয়ে রয়েছি। রাস্তার দক্ষিণ পাশে আর্মিরা নদীর দিকে যাচ্ছে, সেখানে পালিয়ে রয়েছে অনেক মানুষ। সেনাবাহিনীর মধ্যে একজনের বন্দুক লোড করেই ছিল। নেমেই শুরু করলো গুলি। আমরা ভয়ে আর আতঙ্কে ব্রীজের নীচে লুকিয়ে রয়েছি। টু শব্দটি পর্যন্ত করছি না। হঠাৎ আমাদের দেখে বললো, এধার আও। আমরা এগিয়ে গেলাম। কোনো কথা নেই আমাদের তাক করে গুলি করলো। কয়েকটি গুলি মিসও গেল। বুঝলাম আমার আর বাঁচার পথ নাই, আল্লাহ আজ আমাদের এভাবেই মৃত্যু রেখেছে। আমি পেছাতে লাগলাম। এদিকে গুলি হচ্ছে। এরপর আর কি হয়েছে বলতে পারি না।

আবু বক্কার খান আরও বলেন, অনেকক্ষণ পরে জ্ঞান ফিরে দেখলাম দুজন মারা গেছে। আরেকজন গরু জবাই করলে যেমন শব্দ করে তেমন শব্দ করছে তার মুখ দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ছে। আমার শরীরে রক্ত দেখছি না। তখন আমি ভাবলাম আমার তো কিছুই হয় নাই। গামছাটা পেতে শুয়ে থাকার কথা ভাবলাম। কিন্তু চিন্তা করলাম যদি আর্মিরা আবার ফিরে আসে। আমার অস্বস্তি লাগছিল। আমার পিঠের দিকে বিড়বিড় করছিল, তখন পেছনে হাত দিয়ে দেখি তিনটা আঙুল ঢুকে পড়েছে, আর সারা পিঠে রক্ত। পাশের বাড়ির একজন লোক নদীর কাছেই পালিয়ে ছিল। আমি হাত দিয়ে ইশারা করতেই সে নদীতে ঝাপ দিল। আবার ইশারা করার পর আমার কাছে এসে হাত-পা ধরে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করলো। পরে আরও লোকজন এসে কাঁথার মধ্য জড়িয়ে আমাকে নদীর মধ্যে নিলো। খুব পিপাসায় নদীর পানিই খেলাম। গ্রামের পল্লি ডাক্তার এসে ব্যান্ডেজ করে দিল। পরে শুনলাম আমার পাঁজরে, পিঠে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়েছে। ডান পাঁজরের নিচ চামড়ার উপর দিয়ে গুলি চলে গেছে। আমার জ্ঞান না থাকায় মৃত ভেবে চলে গেছে পাকিস্তানি আর্মিরা। তিনি বলেন, মায়ের ১০ আনি গয়না বেঁচে আমার চিকিৎসা হয়। হালের গরু বেঁচে চিকিৎসা হলো। কখনো কোনো সরকারি সহযোগিতা পাইনি। এখনো আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাথা করে। যেখানে বেয়নেটের আঘাত আছে সেখানে চুলকায়, ব্যথা করে।

আবু বক্কার খানের স্ত্রী সোনাভানু বলেন. স্বাধীনতার চার বছর পর আমার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে দেখছি, আমার স্বামীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাথা করে। এর আগে আঘাতের এক স্থানে ঘা হয়ে গিয়েছিল। ছেলে মাহমুদুল হাসান খান বলেন, ছোটোবেলা থেকেই শুনে এসেছি, আমার বাবাসহ ৪ জন পাকিস্তানিদের দেখে ব্রিজের নীচে পালিয়েছিল। তাদের মধ্যে তিনজন গুলি খেয়ে মারা গেছে। আমার আব্বার শরীরে বেয়নেট দিয়ে আঘাত করেছে। অসুস্থ জীবন নিয়েও বাবা আমাদের ভাইবোনদের মানুষ করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *