রফিকুল ইসলাম,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রমত্তা যমুনায় এখন ধু ধু বালুচর। ডিসেম্বর থেকে নদীর অধিকাংশ খাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ। কিছু জায়গা সচল থাকলেও যেতে হচ্ছে ঘুরপথে। এতে অতিরিক্ত অর্থের পাশাপাশি বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে। ফলে নদীতে নৌকা চালিয়ে ও মাছ ধরে যারা সংসার চালাতেন, তারা এখন কাজ হারিয়ে বেকার। অনেকেই নিজের শেষ সম্বল নৌকা ও জাল বিক্রি করে দিয়েছেন। পুঁজি হারিয়ে কেউ কেউ দাদন ব্যবসায়ী ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছে। আবার অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে শহরমুখি হচ্ছেন। যমুনা নদীর তীরবর্তী পাঁচ উপজেলা কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুরে এমন অবস্থা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, জেগে উঠা চরগুলোতে নানা ফসলের আবাদ হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন। তবে এসব পণ্য পরিবহনে একমাত্র সম্বল ঘোড়ার গাড়ি। সেখানেও ব্যয় হয় অতিরিক্ত অর্থ। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে মানুষজনকে বিশাল চর হেঁটেই পাড়ি দিতে হচ্ছে।
কাজিপুরের তেকানী ইউনিয়নের চর কান্তনগরের কৃষক সবুজ মিয়া বলেন, “এ বছর চার বিঘা জমিতে মরিচসহ প্রায় সাত বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফসলের আবাদ করেছি। চরাঞ্চলে এখন প্রচুর পরিমাণে ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হচ্ছে। কিন্তু নদীতে পানি না থাকায় উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।”
কাজিপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন যমুনা নদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত। নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলে এ বছর সবচেয়ে বেশি এক হাজার হেক্টর এলাকায় বিভিন্ন ধরনের ফসলের আবাদ হয়েছে। সেখানে ভুট্টা, তিল, তিসি, কালিবেরো, বাদাম এসবের চাষ হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “যমুনার বিভিন্ন চরাঞ্চলের মধ্যে আন্ত:সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য উপজেলা কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে চরাঞ্চলে কৃষকদের উৎপাদিত ফসল আনা-নেওয়ার সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব হবে।” কাজিপুরের নাটুয়ারপাড়া চরের মৎস্যজীবী নিমাই দাস বলেন, নদীতে অনেক চর জেগে ওঠেছে। পানি না থাকায় মাছের দেখা মিলছে না। আয় নেই, সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আরেক মৎস্যজীবী রহিম উদ্দিন বলেন, নদীতে পানি কমে যাওয়ায় খালগুলোও শুকিয়ে যাচ্ছে। মাছ না থাকায় অনেকেই এই পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। সদর উপজেলার কাওয়াকোলা চরের মৎস্যজীবী মালেক সেখ বলেন, নদীতে চর পড়ায় এখন মাছ পাওয়া যায় না। পৈত্রিক পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করা ছাড়া উপায় নেই।
শহরের মতি সাহেবের ঘাটের মাঝি রফিকুল ইসলাম বলেন, যমুনা ও শাখা নদীগুলোতে পানি কমে যাওয়ায় অনেক সমস্যা হচ্ছে। অনেক জায়গায় চর পড়েছে। এ কারণে নদীপথে নৌকা চলাচল সীমিত হয়ে গেছে। নৌ শ্রমিক আব্দুল করিম বলেন, “আগে নৌকায় চরের মানুষ ও মালামাল পরিবহন করেই সংসার চলত। এখন নদীতে পানি নেই, শুষ্ক মৌসুম আসার আগেই নদী শুকিয়ে গেছে। কাজ না থাকায় পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।” এনায়েতপুর নৌকা ঘাটের ইজারাদার ইউসুফ আলী বলেন, “যেভাবে নদীর পানি কমছে, তাতে নৌকা চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। নদীতে ড্রেজিং করে নৌ পথ তৈরি না করলে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।” চৌহালী থেকে জেলা সদরের আদালতে আসা সবুজ আকন্দ বলেন, “মামলাজনিত কারণে মাঝে মধ্যেই চৌহালী থেকে নৌপথে এনায়েতপুর নৌ ঘাট হয়ে জেলা সদরে যাতায়াত করতে হয়। যমুনা নদীতে এখন পানি না থাকায় কয়েক কিলোমিটার ঘুরপথে শ্যালো নৌকায় চলাচল করতে হচ্ছে। “এতে ১ ঘণ্টার পথ যেতে প্রায় ৩/৪ ঘণ্টা লাগছে। দেরিতে কোর্টে গেলে কোনো কাজ হয় না। তাই আগের দিন জেলা সদরে গিয়ে হোটেলে থাকতে হয়। এতে অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় হয়।” ড্রেজার ব্যবসায়ী আল আমিন বলেন, “যমুনার বালুমহালের বিপুল পরিমাণ বালু দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়ে থাকে। নদীতে পানি না থাকায় প্রায় দুই মাস যাবত নৌ পথে বালু পরিবহনের বাল্কহেড চলাচল করতে পারছে না। এতে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা অর্থনৈতিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।” তবে কয়েকদিন যাবত নদীতে পানি বাড়তে শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।
জেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ জেলার অভ্যন্তরে যমুনা, ইছামতি, হুরাসাগর, বাঙ্গালী, বড়াল, করতোয়া, ফুলজোড়সহ প্রায় ১৩টি নদী রয়েছে। এসব নদীর বেশির ভাগই যমুনা নদীর শাখা হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া চলনবিলে আগে সারাবছর পানি থাকলেও সেটিও বর্তমানে পানিশূন্য। জেলায় স্থায়ী মৎস্যজীবীর সংখ্যা ২৬ হাজার ৮৭৩ জন। এ ছাড়া মৌসুমী মৎস্যজীবী রয়েছে আরো প্রায় পাঁচ হাজার।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে গেছে, যার প্রভাব মৎস্যজীবীদের ওপর পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য ভিজিএফ কার্ড প্রদানের জন্য তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজমুল হুসাইন বলেন, গতিপথ পরিবর্তনের কারণে যমুনা নদীতে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যথাসময়ে নদীর চ্যানেলগুলো ড্রেজিং করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
সিরাজগঞ্জ বিআইডব্লিউটির যুগ্ম পরিচালক ক্যাপ্টেন জি এ এম আলী রেজা বলেন, সম্প্রতি নদীর কয়েকটি স্থানে ড্রেজিং করা হয়েছে। পানি বৃদ্ধি পেলে নদীর বেশকিছু স্থানে খনন করা হবে।
