রফিকুল ইসলাম,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার সলপ রেলওয়ে স্টেশনে ১৯২২ সালে সাদেক আলী খান নামে এক দুধ ও দই বিক্রেতা বিক্রি শুরু করেন বিশেষ বাঁশের চড়কির ঘোল। কালক্রমে সেই ঘোল দেশজুড়ে পরিচিতি পায় সলপের ঘোল হিসেবে। চমৎকার স্বাদ ও গন্ধের জন্য দেশ ছাড়িয়ে সলপের ঘোলের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে বিদেশেও। এতদিন পরও সলপের ঘোলের চাহিদা একটুও কমেনি, উল্টো বেড়েছে। বিশেষ করে রমজান মাস এলে সিরাজগঞ্জ ও আশপাশের এলাকার মানুষের ইফতারে সলপের ঘোল থাকা চাই-ই-চাই। ইতিহাস বলছে, উল্লাপাড়ার পঞ্চক্রোশী ইউনিয়নের রাঘববাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা সাদেক আলী ১৯২২ সালে সলপের প্রভাবশালী জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই ঘোল উৎপাদন শুরু করেন। ওই সময়ে ট্রেন করে ঘোল যেত কলকাতায়ও। সাদেক আলী খানের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে আব্দুল মান্নান খান ঘোল বিক্রি করতেন। মান্নানের ছেলে আব্দুল মালেক ও আব্দুল খালেকের হাত ধরে ঘোলের সুনাম আজও অক্ষুণ্ন।
জানা গেছে, সাদেক আলী তাঁর সময়ে বাঁশের চড়কি দিয়ে জ্বাল দেওয়া দুধ থেকে ঘোল উৎপাদন করতেন। বর্তমানে বাঁশের চড়কির পাশাপাশি কারখানায় বড় পরিসরে ঘোল উৎপাদন যন্ত্রও ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এখনও বাঁশের চড়কির ঘোলের চাহিদাই বেশি। বর্তমানে আব্দুল মালেক ও আব্দুল খালেক দুই ভাই মিলে ঘোলের ব্যবসা করেন। তবে আব্দুল মালেকই মূলত দেখাশোনা করেন ঘোলের কারখানা ও পুরো ব্যবসা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রমজান এলেই সলপের ঘোলের চাহিদা বাড়ে যায় কয়েক গুণ। কারণ শতবর্ষের ঐতিহ্যের ধারক এই ঘোল স্বাদে ও মানে অনন্য। গোটা দেশে ছড়িয়ে আছে এই ঘোলের সুনাম। দেশের বাইরেও যায় সলপের ঘোল। সারা বছর গড়ে প্রতিদিন ঘোল বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৫০ মণ। কিন্তু রমজান মাসে ঘোল বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ থেকে ১২০ মণ। কিন্তু দামের কোনো পরিবর্তন হয় না।
ঘোল বানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে আব্দুল মালেক জানান, দুধ কিনে বড় বড় সসপেনে ৭-৮ ঘণ্টা ধরে ভালোভাবে জ্বাল দিতে হয়। এরপর বিভিন্ন পাত্রে জ্বাল দেওয়া দুধ ঢেলে পৃথক কক্ষে রেখে দেওয়া হয় ঠান্ডা হওয়ার জন্য। দুধ ঠান্ডা হলে পাত্রগুলোর মধ্যে সনাতন পদ্ধতিতে বাঁশের চড়কি ডুবিয়ে রশির সাহায্যে বিশেষ কৌশলে টেনে ঘোরানো হয়। এই কাজ কখনও একা আবার কখনও করা হয় দুইজন মিলে। কিছুক্ষণ চড়কি ঘোরানোর পর উৎপাদিত হয় খাঁটি ঘোল। এর আগে দুধ জ্বাল দেওয়ার সময় তাতে পরিমাণ মতো খাবার সোডা মেশানো হয়। ফলে ঘোলের রং হয় হালকা লাল। অপর দিকে সোডিয়াম বাই-কার্বনেট না মিশিয়ে জ্বাল দেওয়া দুধ থেকে তৈরি হয় মাঠা। যে কারণে মাঠার রং হয় সাদা।
মালেক জানান, বছরের অধিকাংশ সময় প্রতিদিন তাদের কারখানায় ৮০ থেকে ৯০ মণ দুধ কেনা হয়। রমজানে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দুধের প্রয়োজন হয় ১৫০ থেকে ১৬০ মণ। তবে দুধের দাম বাড়লেও ঘোলের দাম বাড়ান না। প্রতি লিটার ঘোল বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা এবং মাঠা ১০০ টাকা লিটার দরে। ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর, চট্টগ্রাম, রংপুর ও বগুড়ায় তাদের দোকানের ১২টি শাখায় এখন প্রতিদিন ঘোল যাচ্ছে। শতবর্ষের ঐতিহ্যের ধারক এবং সুখ্যাতির জন্য সলপের ঘোলকে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেছেন মালেক।
