ePaper

সিরাজগঞ্জে জামায়াত জোটের প্রচারে চাপে বিএনপি

রফিকুল ইসলাম,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ

সিরাজগঞ্জের ছয়টি সংসদীয় আসনে জোরেশোরে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। প্রতিটি আসনেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী জোট। কোনো আসনেই বিএনপিকে ছাড় দিতে নারাজ তারা। জামায়াত জোটের ছোটাছুটি ও প্রচারের কারণে ঘাম ঝরতে শুরু করেছে বিএনপি প্রার্থীদের। তার পরও প্রতিটি আসনেই বিজয়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে বিএনপি। সরেজমিন জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ-৩ ও ৬ আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী জোটের নতুন প্রার্থী ঘোষণা দেওয়ায় ওই দুই আসনে বিএনপি অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন ভোটাররা। বাকি চারটি আসনে দ্বিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা থাকলেও সিরাজগঞ্জ-৪ ও সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে জামায়াত তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ। ওই দুটি আসনে জামায়াতের সাংগঠনিক আধিপত্য তুলনামূলক বেশি। আরও এক-দুটি আসন নিজেদের দখলে নিতে সাংগঠনিক তৎপরতা ক্রমেই বাড়িয়ে যাচ্ছে ১১ দলীয় নির্বাচনী জোট। সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর ও সদরের একাংশ) আসনটি বরাবরই আওয়ামী লীগের এলাকা হিসেবে পরিচিত। তবে গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছে বিএনপি ও জামায়াত। এখান থেকে ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টি থেকে শফিকুল ইসলাম। এরপর ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন শহীদ এম মনসুর আলীর ছোট ছেলে মোহাম্মদ নাসিম। ১৯৯৬ সালে মোহাম্মদ নাসিম সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর) ও সদর-২ আসন থেকে নির্বাচিত হন। সিরাজগঞ্জ-১ আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে তাঁর বড় ভাই মোহাম্মদ সেলিম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ ও ২০২০ সালের উপনির্বাচন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে প্রকৌশলী তানভীর শাকিল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জয় লাভ করেন। এবার এই আসনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও আলোচনার কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থী সেলিম রেজা ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা শাহীনুর আলম। এই আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৪ জন।স্থানীয়দের মতে, নারী ও আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটাররা এখানে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারেন। তাদের মন জয় করতে যমুনার ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন প্রার্থীরা।সিরাজগঞ্জ-২ (সিরাজগঞ্জ সদর ও কামারখন্দ) আসন বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানে ধানের শীষের প্রার্থী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এখান থেকে ১৯৮৬ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তাঁর সহধর্মিণী ও বর্তমান জেলা বিএনপির সভাপতি রুমানা মাহমুদ। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্না এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের জান্নাত আরা হেনরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৯১ সালে বিএনপি থেকে মির্জা মুরাদুজ্জামান এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ নাসিম এ আসনে জয় লাভ করেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এখানে আলোচনার কেন্দ্রে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী। তারা নিজ দলের ভোটব্যাংকের বাইরে সাধারণ ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। এ কারণে দলের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জয়ের জন্য জোরেশোরে প্রচার চালাচ্ছেন বিএনপি প্রার্থী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলটির জেলা শাখার সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম।সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ ও তাড়াশ) বিএনপির আসন হিসেবেই পরিচিত। বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে প্রয়াত আব্দুল মান্নান তালুকদার ১৯৯১ সালের পঞ্চম, ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ, ১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ছিলেন। তবে ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত হন তিনি। এবারের নির্বাচনে তাঁর ছেলে রাহিদ মান্নানসহ বিএনপির প্রায় দেড় ডজন নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পান জেলা বিএনপির তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক এবং রায়গঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আয়নুল হক। এই আসনে প্রথম দিকে জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন পান দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মোহাম্মদ আব্দুস সামাদ। পরে অবশ্য ১১ দলীয় নির্বাচনী জোট থেকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুহা. আব্দুর রউফ সরকারকে চূড়ান্ত প্রার্থী করা হয়। স্থানীয়দের মতে, জামায়াতের প্রার্থী মাঠে থাকলে দ্বিমুখী লড়াই হতো। কিন্তু ১১ দলীয় নির্বাচনী জোটের প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ায় বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের দবির উদ্দিন আহমেদ, ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে প্রয়াত আব্দুল লতিফ মির্জা, ২০০৮ ও ২০২৪ সালে শফিকুল ইসলাম শফিক এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালে প্রয়াত এইচ টি ইমামের ছেলে তানভীর ইমাম আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ ছাড়া ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি থেকে আব্দুল হামিদ তালুকদার, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বিএনপি থেকে এম আকবর আলী এবং ১৯৯৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে শামছুল আলম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির দুবারের সংসদ সদস্য এম আকবর আলী জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। ফলে এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে। সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি ও চৌহালী) আসন তাঁতশিল্পসমৃদ্ধ ও যমুনা নদীর ভাঙনকবলিত। ১৯৮৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে এ আসনে। এর মধ্যে বিএনপি তিনবার, জাতীয় পার্টি দুবার ও আওয়ামী লীগ পাঁচবার জয়ী হয়েছে। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে মফিজ উদ্দিন তালুকদার, ১৯৮৮ সালে শহিদুল ইসলাম খান, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে শহিদুল্লাহ খান এবং ২০০১ সালে বিএনপি থেকে এম মোজাম্মেল হক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালের জুন ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, ২০১৪ সালে আব্দুল মজিদ মণ্ডল এবং ২০১৮ ও ২০২৪ সালে তাঁর ছেলে আব্দুল মমিন মণ্ডল আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বেলকুচি ও চৌহালী পৃথক আসন ছিল। ২০০৮ সালে দুটি উপজেলা একত্র করে সিরাজগঞ্জ-৫ আসন ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। আসনটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীম। আগে দলীয় কোন্দল থাকলেও বর্তমানে সবাই একাট্টা। তাঁর শক্ত প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী। এই আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ও জেলা শাখার নায়েবে আমির অধ্যক্ষ আলী আলম। তিনি ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বেলকুচি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। স্থানীয়দের ধারণা, আলী আলম তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। তাঁতি ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর পক্ষে কাজ করছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব মাহিন সরকার ও সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *