ePaper

সিরাজগঞ্জে কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে সুপেয় পানির উৎস কুয়া

রফিকুল ইসলাম,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ

এক সময় সুপেয় পানির একমাত্র উৎস ছিল- প্রাচীন ঐতিহ্যগুলোর মধ্যে বিলুপ্ত হওয়া ইঁদারা বা কুয়া। মা-বোনদের এসব কুয়া বা ইঁদারা থেকে কলসি দিয়ে পানি তোলা এবং ঘরে আনার চিত্র এখন আর দেখা যায় না। গ্রাম-বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কুয়া বা ইঁদারাগুলো কালের আবর্তে আজ হারিয়ে গেছে, যা এখন শুধুই স্মৃতি। একটা সময় ছিল নদী বিধৌত বাংলা যেন ছিল একটা জলাধার। এই উন্মুক্ত জলাধার ছেড়ে ভারত উপমহাদেশের বাঙালি অধ্যুষিত জনপদের মানুষ কবে থেকে পানযোগ্য পানির জন্য কুয়া বা ইঁদারার ব্যবহার শুরু করে তার ইতিহাস এখনো প্রচ্ছন্ন। আগের দিনে অনেকের বাড়ির আঙ্গিনায় দু’ধরনের কুপ বা ইঁদারা দেখা যেত। ইট, চুন, সুড়কি, সিমেন্ট দিয়ে তৈরি বৃহৎ আকারের কূপ বা ইঁদারা দেখতে পাওয়া যেত। আবার কোনো কোনো বাড়িতে ছোট আকৃতির পোড়া মাটির রিং বা পাট দিয়ে তৈরি কূপ দেখা যেত। এতে কোনো ইট, চুন, সুড়কি, সিমেন্টের প্রয়োজন হতো না। অল্প খরচেই একটি অগভীর কূপ তৈরি করা যেত। এসব পাটের কুয়া বেশির ভাগ হতদরিদ্র, দুস্থ-গরিব শ্রেণির মানুষেরা ব্যবহার করত। সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক সময়ে নিম্নশ্রেণির মানুষ সুপেয় পানির জন্য ধনিক শ্রেণির মানুষের কুয়ার ধারে ভিড় জমাত। তবে প্রত্যেক বাড়িতে নয়। এক কুয়া থেকে প্রায় ৫০টি পরিবার পানি সংগ্রহ করত। গ্রামীণ বধূরা কলসি কাঙ্খে দল বেঁধে আসতেন কুয়া বা ইঁদারা পাড়ে। বদনা, ঠিলার গলায় রশি বেঁধে পানি তুলত কূপ থেকে আর ভরত কলসি। তাছাড়া বাঁশের কোঠায় ঝুলানো লম্বা রশির মাথায় বাঁধা বালতিতে রশি টেনে পানি তোলা কারো কারো মূর্ত রূপ। খেটে খাওয়া কৃষককরা পানি ভর্তি কলসি নিয়ে যেত তাদের জমিতে। কাজের অবসরে মিটাত তাদের পানির পিপাসা। এই ইঁদারা ব্রিটিশ আমলে প্রত্যেকটি রেলস্টেশন, আদালত চত্বরে, থানা চত্বরে এবং অফিস-আদালতের চত্বরে সরকারিভাবে নির্মাণ করা হতো বলে জানায় চৌবাড়ি গ্রামের বয়োবৃদ্ধ আনিস আলী (৯০)। কর্ণসুতি গ্রামের বয়োবৃদ্ধা আছিয়া বেওয়া (৮৫) জানান, কি আর কমু বাবা কি জানি ভুচ্চুত কইরা ঠাসি দেয় আর পুচ্চুত কইরা পানি বাড়ায়। আগের নেহাল ঠিলা দিয়া কুয়া থ্যাইকা পানি তুলবার নিলে গেইদানিরা বুজলোনে কেবা ঠ্যালা। সিরাজগঞ্জের মানুষের কাছে বেশি পরিচিত কুয়া ও ইঁদারা কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে গেছে। আধুনিকতার ছোয়ায় পানি পান করতে মানুষকে কোনো কষ্টই করতে হয় না। হাতের কাছে টিউবওয়েলে বা ট্যাবে চাপ দিলেই পাওয়া যায় পানি। বাড়ির ছাদের উপর পানির ট্যাঙ্ক তো রয়েছেই। শহরগুলোতে সেন্ট্রাল ওয়াটার রির্জাভার থেকে প্রতিনিয়ত লাখ লাখ গ্যালন পানি প্রতিটি বাড়িতে সরবরাহ করা হয়। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বর্তমানে পানিয়-জলের কষ্ট দূর হয়েছে বলে জানান, সিরাজগঞ্জ সাবেক পৌর মেয়র সৈয়দ আব্দুর রউফ মুক্তা। কিন্তু কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে সেইসব কুয়া। তাই তো এখন আর গ্রামীণ বধূদের দেখা মেলে না কুয়ার পাড়ে। কূপগুলো অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *