এস,এ,রশিদ (ঢাকা) সাভার
সাভার পৌর এলাকায় গত পাঁচ মাসে ঘটে যাওয়া ছয়টি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জট খুলেছে। পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে মশিউর রহমান সম্রাট ওরফে সবুজ শেখ নামের এক সিরিয়াল কিলার। খুনের নেশায় মত্ত এই ব্যক্তি নিজেকে ভবঘুরে পরিচয় দিয়ে সাভারের পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারে আস্তানা গেড়েছিলেন। তার ভাষায়, হত্যাকাণ্ড ছিল এক ধরনের ‘শাস্তি’, যাকে তিনি কোডল্যাঙ্গুয়েজে বলতেন “থার্টি ফোর” বা “সানডে মানডে ক্লোজ”।যেভাবে খুনের নেশায় মেতে ওঠেন সবুজ পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সবুজ শেখ জানিয়েছেন, তিনি মূলত কোনো ভবঘুরে বা পাগলকে ‘অনৈতিক’ কাজে লিপ্ত হতে দেখলেই খেপে যেতেন এবং তাদের হত্যা করতেন। তবে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র। সবুজ বিভিন্ন সময় নারীদের ফুসলিয়ে পরিত্যক্ত ভবনে নিয়ে আসতেন এবং শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতেন। যদি ওই নারীরা অন্য কারো সঙ্গে কথা বলতেন বা লিপ্ত হতেন, তবেই তিনি তাদের নৃশংসভাবে খুন করতেন। সাভার থানার পরিদর্শক (অপারেশন) হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘সবুজ মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। মানুষ খুন করা তার নেশায় পরিণত হয়েছিল। তিনি দিনের বেলা থানার আশপাশেই ঘুরতেন, আর রাতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পদচারী-সেতু থেকে শিকার ধরতেন।’তদন্তে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৪ জুলাই আসমা বেগম নামে এক বৃদ্ধাকে হত্যার পর সবুজ সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে আস্তানা গাড়েন। এরপর থেকে গত পাঁচ মাসে ওই ভবনের ভেতর থেকে একের পর এক পাঁচটি লাশ উদ্ধার করা হয়। ভবনটি জনমানবহীন হওয়ায় সবুজ এটিকে তার ‘কিলিং জোন’ হিসেবে ব্যবহার করতেন। শেষ রক্ষা হলো না যেভাবে গত শুক্রবার রাতে পুলিশ নিয়মিত নজরদারির অংশ হিসেবে ওই কমিউনিটি সেন্টারে গেলে সবুজের বিছানায় এক তরুণীকে দেখতে পায়। ওই তরুণী নিজেকে সবুজের বোন পরিচয় দিলেও পরদিন শনিবার রাতেই সেই তরুণী এবং অন্য এক যুবককে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেন সবুজ। রোববার দুপুরে জোড়া লাশ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, খুনি আর কেউ নন—স্বয়ং ওই ভবঘুরে ‘সম্রাট’ বা সবুজ। রোববার সন্ধ্যায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার এড়াতে সবুজ শেখ নিজের নাম পরিচয় গোপন করে ‘মশিউর রহমান সম্রাট’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তবে পুলিশের নিবিড় তদন্তে বেরিয়ে আসে তার আসল পরিচয়। তার প্রকৃত নাম সবুজ শেখ, পিতা পান্না শেখ। তার বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার মোসামান্দা গ্রামে। পুলিশের বক্তব্য ঢাকা জেলা পুলিশের সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, সবুজ শেখ আদালতে ৬ জনকেই হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি মূলত শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের নির্জন স্থানে নিয়ে আসতেন। সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী বলেন, ‘খুনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি দায় স্বীকার করেছেন। এখন আমরা নিহতদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছি। এই ছয়টি খুনের বাইরেও তিনি আরও কোনো অপরাধে জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ বর্তমানে ঘাতক সবুজ শেখ কারাগারে রয়েছেন। এই রোমহর্ষক ঘটনার বিস্তারিত জানার পর সাভার এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
