ePaper

বৈরী আবহাওয়ায় মধু সংগ্রহ ব্যাহত সিরাজগঞ্জে ক্ষতির মুখে মৌচাষিরা

রফিকুল ইসলাম,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

সিরাজগঞ্জের চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশ উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সরিষা ফুলের হলুদের অপার সৌন্দর্য ছড়িয়ে রয়েছে। সরিষার ফুল থেকে মৌমাছি মধু আহরণ করে মৌ বাক্সে নিয়ে আসে। খামারিরা শত শত মৌ বাক্স বসিয়ে টনকে টন মধু সংগ্রহ করে থাকেন। নামি-দামি কোম্পানি থেকে শুরু করে অনলাইনে মধু ব্যবসায়ীরা পর্যন্ত মাঠ পর্যায় থেকে পাইকারি দরে এ অঞ্চল থেকে মধু সংগ্রহ করে থাকেন। কিন্তু এ বছরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাসজুড়ে মৃদু শৈত্য প্রবাহের কারণে সারাদেশের ন্যায় চলনবিল অঞ্চলেও তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। ঘন কুয়াশার কারণে দিনের বেশির ভাগ সময়ই ফসলের মাঠ ভেজা থাকছে। যার ফলে মৌমাছি মধু সংগ্রহ করতে পারছে না, এবং নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এতে খামারীরা আশংকা প্রকাশ করেছেন যে, এ বছরে লক্ষ্যমাত্রার কম মধু সংগ্রহ হবে। সরেজমিনে দেখা গেছে, বৈরী আবহাওয়া, মৌমাছির বিভিন্ন রোগ ও নির্বিচারে কীটনাশক প্রয়োগের কারণে মৌমাছি মারা যাচ্ছে। নানা প্রতিকূলতায় কাঙ্খিত মধু সংগ্রহ করতে না পারায় লোকসানের মুখে পড়তে হবে মৌচাষিদের। অথচ সরিষা ও মধু কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চলনবিল অঞ্চলে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার বাজার। বিলের অভ্যন্তরে গেলে দেখা যায়, শত শত মৌখামারীরা মধু সংগ্রহের জন্য মৌ বাক্স বসিয়েছেন। মৌচাষিরা জানান, এখন আর বন্য মৌমাছির মৌচাকের খুব একটা দেখা মেলে না। বন্য মৌমাছি মানুষ আবাসিক করে ফেলেছে। বর্তমানে সরিষার মধু সংগ্রহ করা হয় মৌখামার থেকে। সাম্প্রতি তাড়াশ উপজেলার কামারশোন বিলে গিয়ে দেখা গেছে, মধু আহরণকারীরা সবাই ব্যস্ত। কেউ বাক্স থেকে মধু বের করছেন, কেউ বাক্স ঠিক করে দিচ্ছেন, কেউবা ড্রামে মধু ভরছেন। এর মধ্যে ক্রেতারা এসে মধু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি কেজি মধু মাঠ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মধু ব্যবসায়ী সোলায়মান আলী বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও চলনবিলে সরিষার মধুর জন্য ১৫০টি মৌ বাক্স স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু শীতের কারণে মৌমাছি বাঁচাতেই তারা হিমশীতল। কৃষি বিভাগ জানাচ্ছে, মৌমাছি শুধু মধুই সংগ্রহ করে না, সরিষার পরাগায়ণেও ভূমিকা রাখে। ফলে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ফলন বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে চলনবিলের তরল সোনায় এ বছর অশনিসংকেত দেখা দিয়েছে। এ ধরনের আবহাওয়া চলমান থাকলে কোটি কোটি টাকার বাজার ২৫ শতাংশে নেমে আসবে। লোকসান গুণতে হবে মৌখামারীদের, এমনটাই জানিয়েছেন তারা। মৌখামারের স্বত্বাধিকারী আব্দুল কাদের বলেন, তীব্র শীতে মৌমাছি মারা যাচ্ছে। সরিষা ফুল ভেজা থাকায় জীবিত মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করছে না, এমনকি বংশ বিস্তারও করছে না। এ ছাড়াও বাক্সের মৌমাছি ভেরোয়া মাইট, আমেরিকান ফাউলব্রেড, নোসেমা, অ্যাকারাপিসোসিস (ট্রাইক্যাল মাইট), বিকৃত ডানা ভাইরাস, ব্ল্যাক কুইন সেল ভাইরাস ও পাতলা পায়খানা ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত। উপরন্তু কৃষক নির্বিচারে সরিষার জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করছেন, যার ফলে আরও মৌমাছি মারা যাচ্ছে। এসব কারণে এ বছরে মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছেন, সকালে নয়, বরং বিকেলে সরিষার জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করতে। কারণ তখন মৌমাছি মৌ বাক্সে ফিরে আসে। তাদের জীবনও বাঁচে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের উপপরিচালক মনজুরে মওলা জানান, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় চলতি মৌসুমে সরিষার মধু আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার সম্ভাবনার তথ্য মাঠ পর্যায় থেকে আসছে। তবে আবহাওয়া এখন অনেকটা উন্নত হয়েছে, দিনের তাপমাত্রা বাড়ছে। এতে মৌখামারীরা ক্ষতির অনেকটাই পূরণ করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *