ইয়াকুব নবী ইমন, নোয়াখালী
শীত এলেই একসময় নোয়াখালীর গ্রামগুলোতে অন্যরকম এক ব্যস্ততা দেখা যেত। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে হাঁটলে চোখে পড়ত সারি সারি খেজুর গাছ, গাছের মাথায় ঝুলে থাকা মাটির হাঁড়ি আর সেখান থেকে টুপটুপ ঝরে পড়া মিষ্টি রস। সেই রস ঘিরেই ছিল শীতের সকাল, অতিথি আপ্যায়ন, পিঠা-পুলির আয়োজন। আজ সেই দৃশ্য বিরণ। নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় খেজুর গাছ ও খেজুরের রস এখন বিলুপ্তির পথে। দুই তিন দশক আগেও জেলার প্রতিটি এলাকাতেই সারিসারি খেজুর গাছ ছিল। শীত মৌসুম মানেই রস সংগ্রহ, গুড় জ্বালানো, পাটালি বানানোর ধুম। এখন এই ব্যস্ততা নেই বললেই চলে। খেজুর গাছ হারিয়ে যাওয়ার পেছনে নানা কারণ বিদ্যমান। উন্নয়নের নামে রাস্তা, ঘরবাড়ি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরির সময় নির্বিচারে কেটে ফেলা হয়েছে অসংখ্য খেজুর গাছ। পাশাপাশি নতুন করে খেজুর গাছ লাগানোর আগ্রহও কমে গেছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই জানেন না, এই গাছ একসময় গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। আরেকটি বড় কারণ হলো রস সংগ্রহকারীদের সংকট। খেজুর গাছে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বিকল্প পেশার সুযোগ বাড়ায় অনেক গাছি এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে রস সংগ্রহ কমেছে, কমেছে গুড় তৈরিও। স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নানা আলোচনা ও গুজবও খেজুরের রসের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে। এতে চাহিদা কমেছে, আর চাহিদা কমলে গাছ সংরক্ষণের আগ্রহও হারিয়ে যায় এটাই বাস্তবতা। খেজুর গাছ শুধু রস বা গুড়ের উৎস নয় এটি গ্রামীণ পরিবেশের নীরব রক্ষক। এই গাছ মাটির ক্ষয় রোধ করে, পাখি ও কীটপতঙ্গের আশ্রয় জোগায় এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রকৃতিতে এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করে। খেজুর গাছ হারানো মানে শুধু একটি খাদ্য উপাদান হারানো নয়, হারিয়ে যাওয়া এক টুকরো সংস্কৃতি, এক প্রজন্মের শীতের আনন্দ। এখনই উদ্যোগ না নিলে এ অঞ্চল থেকে খেজুর গাছ ও খেজুরের রস পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে। পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ রোপণ, গাছিদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ রস সংগ্রহ পদ্ধতি চালু করা জরুরি। একই সঙ্গে খেজুরের গুড় ও রসের বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে গ্রামীণ মানুষের আয়ও বাড়তে পারে। নোয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার আশিষ কুমার কর জানান, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। বন বিভাগসহ অন্যান্য সংস্থাগুলো সাথে কথা বলে খেজুর গাছ বৃদ্ধির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
