ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার যদুয়ার গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী ফাতেমা বেগম। দীর্ঘদিনের মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন তিনি। গত ২৭ মার্চ ভোরে পরিবারের অগোচরে বারান্দার তীরের সঙ্গে প্লাস্টিকের দড়িতে ঝুলে না ফেরার দেশে চলে যান এই বৃদ্ধা। ঠিক একই দিনে বিষক্রিয়ায় ধুঁকতে ধুঁকতে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাণ হারান ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আরাজী পাইক পাড়ার ৩৩ বছর বয়সী দিনমজুর দুলাল হোসেন। ফাতেমা কিংবা দুলাল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; ঠাকুরগাঁও জেলায় এখন এক ভয়াবহ উদ্বেগের নাম ‘আত্মহত্যা’। জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এই প্রবণতা, যা এখন মানুষের জীবনাবসানের এক করুণ মিছিলে পরিণত হয়েছে। ঠাকুরগাঁও এর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জিআরও শাখার তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চ মাসের প্রথম ২৭ দিনেই জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৮ জন মানুষ। এর মধ্যে বিষপানে ৬ জন পুরুষ, ফাঁসিতে ৪ জন পুরুষ এবং আগুনে পুড়ে ও পানিতে ডুবে আরও ২ জন পুরুষের মৃত্যু হয়েছে। নারীদের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও ভয়াবহ; ফাঁসিতে আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন এবং পানিতে ডুবে ও আগুনে পুড়ে মারা গেছেন আরও ৬ জন। বছরের শুরু থেকে অর্থাৎ ২ জানুয়ারি থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত গত ৮৫ দিনে জেলায় মোট ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা আগের তুলনায় উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।আদালত সূত্রে জানা গেছে, নথিপত্রে প্রতিদিনই কোনো না কোনো অপমৃত্যুর মামলা লিপিবদ্ধ করতে হচ্ছে। জিআরও মো. ফরিদুজ্জামান বলেন, “বিগত মাসগুলোর তুলনায় চলতি মাসে মৃত্যুর হার এবং উদ্বেগজনক পরিস্থিতি অনেক বেড়েছে।” জেলার সিভিল সার্জন মো. আনিছুর রহমান বলেন, পারিবারিক কলহ, মানসিক বিষন্নতা এবং দীর্ঘমেয়াদী রোগভোগের কারণে অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। সামাজিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংকটকে এই অপমৃত্যু বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন ঠাকুরগাঁওয়ের ‘সৃজন’-এর সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতির লাগাম টানতে কেবল প্রশাসনিক নজরদারি নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা ও তৃণমূল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পরেছে।
