ফয়সাল আলম সাগর,কক্সবাজার প্রতিনিধি (ভ্রাম্যমাণ)
বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যস্ত ও সংবেদনশীল পর্যটন এলাকা কক্সবাজার। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমনে মুখর থাকে এই শহর। তবে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, পর্যটক হয়রানি, অবৈধ দখল ও প্রতারণার অভিযোগে কক্সবাজারের পর্যটন ভাবমূর্তি বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে।এই বাস্তবতায় কক্সবাজারে ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে অপরাধ দমনে নেওয়া কঠোর অবস্থান ইতোমধ্যেই সর্বমহলে প্রশংসা কুড়াচ্ছে।দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ কক্সবাজারের বিভিন্ন পর্যটন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। সমুদ্রসৈকত, হোটেল-মোটেল জোন, কলাতলী, লাবণী পয়েন্ট, ইনানী, হিমছড়ি ও মেরিন ড্রাইভ ঘুরে তিনি পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সেবাদানকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।পরিদর্শনকালে তিনি কক্সবাজারে ছয়টি বড় সমস্যা চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে রয়েছে—
১. পর্যটকদের ওপর প্রকাশ্য চাঁদাবাজি
২. হোটেল ও রেস্টুরেন্টে অতিরিক্ত বিল আদায়
৩. সরকারি জমি ও ফুটপাতে অবৈধ দোকান ও স্থাপনা দখল
৪. রাতের বেলায় ছিনতাই ও মাদক কারবার
৫. ভুয়া ট্যুর গাইড ও সেবাদানকারীদের প্রতারণা
৬. স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্য
এসব অপরাধের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেন।
তার নির্দেশনায় ট্যুরিস্ট পুলিশ বিশেষ অভিযান শুরু করে। সমুদ্রসৈকতে ঘোড়া চালানো, বিচ বেড, ছবি তোলা ও খাবার বিক্রিতে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগে একাধিক ব্যক্তিকে আটক ও জরিমানা করা হয়। কোথাও কোথাও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তিও কার্যকর করা হয়।
একই সঙ্গে সৈকত সংলগ্ন ফুটপাত, বালিয়াড়ি ও সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যৌথ অভিযান চালানো হয়। এতে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হয়েছে, অন্যদিকে পর্যটকদের চলাচল আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের বিভিন্ন অভিযানের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। কখনো তাকে দেখা গেছে সৈকতে হেঁটে হেঁটে পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলতে, আবার কখনো সরাসরি অভিযানে নেতৃত্ব দিতে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, আগে ট্যুরিস্ট পুলিশের উপস্থিতি তেমনভাবে চোখে পড়েনি। তবে এখন বাহিনীটি মাঠপর্যায়ে একটি সক্রিয় ও কার্যকর ইউনিট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
হোটেল ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলেন, “আগে কিছু চাঁদাবাজ চক্র পর্যটকদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করত। এতে আমাদের ব্যবসার সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছিল। আপেল মাহমুদের দায়িত্ব নেওয়ার পর এসবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
একজন পর্যটক বলেন, “আগে সমুদ্রসৈকতে এলেই নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হতো। এবার এসে দেখছি ট্যুরিস্ট পুলিশ অনেক বেশি সক্রিয়। নিরাপত্তার অনুভূতিও বেড়েছে।”
ট্যুরিস্ট পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত আইজি মো. মাইনুল হাসান বলেন, “পর্যটন শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। কক্সবাজারে আপেল মাহমুদের নেতৃত্বে ট্যুরিস্ট পুলিশ মাঠপর্যায়ে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।”
তিনি আরও বলেন, “ট্যুরিস্ট পুলিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী বাহিনী নয়, এটি একটি সেবা প্রদানকারী ইউনিট। পর্যটকদের সঙ্গে পেশাদার ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করতে সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।”
সব মিলিয়ে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও পর্যটক হয়রানির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের কঠোর অবস্থান কক্সবাজারকে একটি নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
