ePaper

উচ্চশিক্ষায় শুদ্ধি ফেরাতে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি- প্রফেসর ড. মো: আবু তালেব

একটি জাতির জ্ঞানভিত্তিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি তার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মুক্তবুদ্ধির বিকাশের কেন্দ্র। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বহু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনিয়মের অভিযোগ বারবার সামনে আসছে। এসব ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং পুরো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই উচ্চশিক্ষায় শুদ্ধতা ফিরিয়ে আনতে এখন কার্যকর ও দৃঢ? পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তদারকির দায়িত্বে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব পালন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবুও নানা সময়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকসহ বিভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বজনপ্রীতি, অনাকাঙ্খিত প্রভাব কিংবা অস্বচ্ছতার অভিযোগ ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থী বঞ্চিত হন, আর অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য কেউ প্রভাবের জোরে সুবিধা পেয়ে যান। এমন পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত অন্যায়ই নয়; এটি উচ্চশিক্ষার মানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শিক্ষক হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ। একজন যোগ্য শিক্ষক কেবল পাঠদানই করেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি বিকাশে অনুপ্রাণিত করেন, গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন এবং সমাজকে আলোকিত করেন। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি মেধা ও গবেষণার বদলে অন্য বিবেচনা প্রাধান্য পায়, তবে শিক্ষার মান স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর ফল ভোগ করতে হয় শিক্ষার্থী, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে।

একইভাবে প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার অভাব উদ্বেগজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কিংবা ক্রয় কার্যক্রম নিয়ে মাঝে মধ্যেই প্রশ্ন ওঠে। এসব অনিয়মের ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের সম্পদের অপচয় হয়, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি মানুষের বিশ্বাসও নষ্ট হয়। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা যেখানে সততা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা সর্বোচ্চ মানদণ্ড হওয়ার কথা; কিন্তু বাস্তবে যখন তার ব্যত্যয় ঘটে, তখন তা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রথমত, উচ্চশিক্ষায় শুদ্ধতা ফিরিয়ে আনতে দরকার শক্তিশালী ও কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন। শিক্ষকসহ বিভিন্ন নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে অভিন্ন ও স্বচ্ছ মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। প্রার্থীদের একাডেমিক অর্জন, গবেষণা প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে অবদান এবং শিক্ষাদানের অভিজ্ঞতাকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে যত বেশি স্বচ্ছ করা যাবে, তত বেশি আস্থা ফিরবে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর কার্যকর নজরদারি জোরদার করা জরুরি। অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে কেউ অনিয়মের শিকার হলে নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। অনিয়মের ক্ষেত্রে শাস্তির নজির তৈরি না হলে শুদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন প্রক্রিয়া, প্রার্থীদের স্কোরিং এবং ফলাফল প্রকাশ—সবকিছু অনলাইনে স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমে যায়। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ও প্রকল্প ব্যয়ের তথ্যও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে জবাবদিহিতা বাড়ে।

চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। স্বায়ত্তশাসন মানে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ নয়; বরং তা দায়িত্বশীল ও নৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে একাডেমিক উৎকর্ষ অর্জনের সুযোগ তৈরি করে। তাই উপাচার্যসহ শীর্ষ প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, উচ্চশিক্ষা একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পায়, তবে জাতির মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই উচ্চশিক্ষাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে একটি সুস্থ একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবারও জ্ঞানচর্চার প্রকৃত কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের মর্যাদা ফিরে পাবে। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের পাশাপাশি সরকারের দৃঢ? ও সময়োপযোগী উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।

লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *