একসময়ের সবুজ-শ্যামল ঢাকা আজ ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এক কংক্রিটের নগরীতে। উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নিয়ন্ত্রণহীন শিল্পায়ন ও পরিবেশ আইন প্রয়োগে শৈথিল্যের ফলে রাজধানী ঢাকা আজ মারাত্নক পরিবেশ দূষণের কবলে। বাতাস, পানি, শব্দ-প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঢাকা আজ বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদন্ড অনুযায়ী ঢাকায় বায়ু দূষণের মাত্রা বছরের অধিকাংশ সময়েই অস্বাস্থ্যকর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করে। ইটভাটা, পুরোনো যানবাহন, নির্মাণ কাজের ধুলাবালি এবং শিল্পকারখানার নির্গমন- সব মিলেয়ে ঢাকার বাতাস আজ বিষাক্ত। শ্বাস নিতে গিয়ে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে, বাড়ছে অ্যাজমা, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগসহ নানা জটিলতা। অথচ এই নীরব ঘাতক দূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ চোখে পড়ে না। শুধু বাতাস নয়, ঢাকার নদী ও জলাশয়গুলোও আজ দূষণের ভারে জর্জরিত। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা- নদীর নাম থাকলেও প্রাণ নেই। শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের অপরিশোধিত পানি সরাসরি নদীতে ফেলার ফলে এসব জলাধার কার্যত বিষাক্ত নালায় পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপর।
সবচেয়ে উদ্বোগজনক বিষয় হলো, ঢাকার সবুজের দ্রুত বিলুপ্তি। খেলার মাঠ, পার্ক, জলাশয় দখল হয়ে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। গাছ কাটার বিপরীতে নতুন গাছ লাগানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ প্রায় অনুপস্থিত। ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে, নগর তাপদ্বীপে পরিণত হচ্ছে ঢাকা- যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।পরিবেশ রক্ষায় আইন আছে, নীতিমালা আছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও আছে। কিন্তু দুর্বল প্রয়োগ, সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে সেগুলো কাগজেই রয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখতে হলে এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে-ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ, গণপরিবহন আধুনিকায়ন, সবুজ এলাকা সংরক্ষণ এবং পরিবেশ আইন কার্যকর প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই । সবুজ হারিয়ে ধূসর হয়ে যাওয়া ঢাকা আমাদেরই সৃষ্টি; এটি কোনো স্বাভাবিক নিয়তি নয়; এটি নীতিগত ব্যর্থতার ফল। এখন প্রশ্ন হলো- আমরা কি এই ধূসর ভবিষ্যৎ মেনে নেব, নাকি টেকসই ও বাসযোগ্য রাজধানী গড়তে দায়িত্ব নেব? সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষণটি দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।
