ঢাকা, শনিবার, ২৬শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মাদারীপুর শহরের মোড়ে মোড়ে জমে উঠেছে শীতের পিঠা বিক্রির উৎসব

সকালের কুয়াশা কিংবা সন্ধ্যার হিমেল বাতাসে ভাপা পিঠার গরম আর সুগন্ধি ধোঁয়ায় মন আনচান করে ওঠে। সরষে বাটা, ধনে পাতা বাটা, অথবা শুঁটকির ভর্তা মাখিয়ে চিতই পিঠা মুখে দিলে ঝালে কান গরম হয়ে শীত পালায়। শীতের ভাঁপা ও চিতই পিঠা গ্রাম বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। শীতের আবরণ গায়ে লাগলে মনে পরে যায় পরিচিত এই পিঠা গুলো কথা। এখন আর বানানোর দৃশ্য আগের মতো ঘরে ঘরে খুবই কম দেখা যায়। সে কারণে ঘরের বাইরের দোকানের পিঠাই একমাত্র ভরসা। আর সে প্রয়োজন থেকেই শীত না আসতেই মাদারীপুরে সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে রাস্তার মোড়ে-মোড়ে গড়ে উঠেছে খোলা আকাশের নিচে বা ভ্যান গাড়ির উপরে পিঠার দোকান।
পিঠা প্রেমি মানুষ পিঠার স্বাদ গ্রহণ করতে ফুটপাতের এসব পিঠার দোকানে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ভিড় করছেন। আবার অনেককেই দেখা যাচ্ছে পিঠার দোকানের চুলার পাশে বসেই গরম পিঠা খাওয়াকে রেওয়াজে পরিণত করেছেন। অনেকে পরিবারের চাহিদা মেটাতে পিঠা ক্রয় করে বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন। তবে শ্রমজীবী, রিক্সা-ভ্যান চালক, ড্রাইভার, বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত শ্রমিকসহ অভিজাত শ্রেনির লোকজনের কাছে অত্যন্ত প্রিয় খাবার শিতের পিঠা। এই শীতে ফুটপাতের পিঠাওয়ালা ভদ্রঘরের অভিজাত গৃহবধূদের মুক্তি দিয়েছে পিঠা তৈরির কষ্ট থেকে। এসব পিঠার দোকান বসছে প্রতিদিন ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা এবং বিকাল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। এ সমস্থ ভাসমান পিঠার দোকানের অধিকাংশ মালিকরাই হলো হতদরিদ্র পরিবারের । স্বচ্ছছলতা ফেরাতে সংসারে অর্থের যোগান দিতে তারা রাস্তার পাশে চিতই পিঠা ও ভাঁপা পিঠা তৈরি করে বিক্রি করছে।
মাদারীপুর সদর নদী তীরবর্তী উপজেলা হলেও এখনও তেমন শীতের আমেজ নেই। তবে শীত না পড়লেও ধুম পড়েছে ফুটপাতে পিঠা বিক্রির। চিতই পিঠা খেতে ফুটপাতের দোকানগুলোতে ভিড় করছেন পিঠা প্রেমীরা। সিরিয়াল দিয়ে পিঠা খাচ্ছে মানুষ। আবার অনেককে পার্সেল করে পরিবারের সদস্যদের জন্য পিঠা বাসায় নিতেও দেখা যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,উপজেলার চৌরাস্তায় মোড়ে, কাজীর টেক পুরাতন ফেরিঘাট , পাকা মসজিদ , বাহেরচর কাতলা, কোটের মোড়,জেলখানার কোনাসহ বিভিন্ন অলি-গলিতে রা¯তার ফুটপাতে ও মোড়ে মোড়ে চলছে ভাঁপা পিঠা বিক্রির ধুম। ভাঁপা পিঠার পাশাপাশি বিক্রি করছে চিতই পিঠাও। বিশেষ করে সন্ধ্যার পরেই জমে উঠে এসব পিঠা বিক্রি। এই পিঠার স্বাদ পেতে রিকশা-চালক, দিনমজুর, শিশু-কিশোর, ছুটির দিনে চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী সব শ্রেণি-পেশার মানুষই পিঠার দোকানে ভিড় করছে।
রাস্তার পাশে এবং মোড়ে মোড়ে দরিদ্র লোকজন এসব ভ্রাম্যমাণ পিঠার দোকান দিয়েছেন। পুরষদের পাশাপাশি অনেক নারীও দোকানে পিঠা বিক্রি করছেন। সংসারের পাশাপাশি তারা বাড়তি আয় করছেন। তবে পিঠা বিক্রেতা বলছেন চালসহ দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি হলেও পিঠার দাম বাড়েনি।
চৌরাস্তা অটো স্ট্যান্ডের সামনে কাজী লিমন ইসলাম পিঠা খেতে খেতে বলেন, সব ধরনের ক্রেতা এখানে পিঠা খেতে আসে। আবার কেউ কেউ বাড়িতে ছেলে-মেয়েদের জন্যও পিঠা কিনে নিয়ে যান।আমি যশোর থেকে এসে মাদারীপুরে রিকশা চালায় অনেক বছর ধরে। কাজের কারণে বাড়িতে গিয়ে পিঠা খাওয়ার সময় হয়ে ওঠে না। তাই এখানে সেই স্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
শরিয়াতপুর জেলা থেকে পিঠা কিনতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী আরমান তালুকদার জানান,শীত পড়া শুর হলে মাদারীপুর শহরের পিঠা বিক্রি আগে শুর হয় আমাদের জেলা থেকে।এবং শীতের সময় পিঠার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। গরম গরম চিতই পিঠার সঙ্গে বিভিন্ন মসলা মুখে পানি এনে দেয়। ব্যস্ত জীবনে বাসায় পিঠা বানানোর সময় না থাকায় তাই দোকান থেকে বাসায় পিঠা কিনে নিয়ে যাচ্ছি।’
পিঠা বিক্রেতা জমেলা খাতুন বলেন, দীর্ঘ সাত বছর যাবত এখানে পিঠা বিক্রি করি।আমার স্বামী নেই। হার্টের সমস্যা অনেক অসুস্থ তাপরেও ছেলে সন্তান নিয়ে আমি এখানেই পিটা বিক্রি করে থাকি।শীতের ভাব কম থাকায় আগের মতো তেমন পিটা বিক্রি হয় না। আমার চলতে অনেক কষ্ট হয়।সরকার যদি আমাকে একটু সাহায্য করতো তাহলে চিকিৎসা করতে পেতাম।
ফেরিঘাট এলাকার ষাটোর্ধ এক পিঠা বিক্রিতা মাকসুদা বেগম জানান, আমি দিনে রাস্তার কাম করি।আর রাতে রাস্তার পাশে বসেই পিটা বিক্রি করি। এখন শীত কম থাকায় পিঠা তেমন চলে না। যদি একটু চলতো তাহলে আমার বৃদ্ধ স্বামী নিয়ে খেয়ে বাচতে পারতাম।
পিঠা বিক্রেতা সামাদ মিয়া জানান, শীত আসতেই দোকানে কাজের চাপ বেড়ে যায়। পিঠা বানানো থেকে সবকিছু করতে হয়। ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত সময় পার হয়। তিনি ৫টি চুলায় পিঠা তৈরি করেন। প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে পিঠা বানানো ও বিক্রি।

বাহেরচরকাতলা এলাকার পিঠা বিক্রেতা পলি বেগম বলেন, চালের গুঁড়া দিয়ে চিতই ও ভাপা পিঠা বানান। তার তৈরি পিঠার মান ভালো হওয়ায় সিরিয়াল দিয়ে সবাই পিঠা খায়। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় ৫ থেকে ১০ কেজি চালের পিঠা বিক্রি করেন তিনি। এছাড়া শহরে তার মতো আরও অনেক পিঠা বিক্রেতা আছে। শীত যত বাড়বে তাদের পিঠা বিক্রিও ততো বাড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Email this to someone
email
Print this page
Print
Pin on Pinterest
Pinterest

দৈনিক নবচেতনার ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন