ঢাকা, শনিবার, ২৬শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

টেকনাফে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা উন্নতকরণ করতে হবে

চিকিৎসা মানুষের অন্যতম একটি মৌলিক চাহিদা। আর প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল হোক যেকোনো অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের যথার্থ চিকিৎসাসেবা পাওয়া তার অধিকার। কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ যদি চিকিৎসকদের দায়িত্বহীনতার জন্য যথার্থ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে সেটি ভুক্তভোগী তথা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক একটি বিষয়। তেমনি হৃদয়বিদারক অবস্থায় দিনানিপাত করছেন টেকনাফ উপজেলার বাসিন্দা ও সেন্টমার্টিনর ১০ হাজারের মানুষ।

গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে গড়ে উঠেছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে উপজেলা থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে চিকিৎসা সেবা। কিন্তু চিকিৎসক,
টেকনিশিয়ানসহ অন্যান্য জনবলের সংকটে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও সেন্টমার্টিন হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার বেহাল দশা। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই কোন টেকনিশিয়ান। ফলে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এখানকার হাজার, হাজার মানুষ।

#নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার প্রয়োজন#

নারীকে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে অধিকারসম্পন্ন নাগরিক ও মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ১৯৮৩ সাল থেকে নারীপক্ষ কাজ করে আসছে। নারীপক্ষ বর্তমানে ছয়টি ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করে তার মধ্যে ‘নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার’ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।নারীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য আলোচনায় ‘যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার’ এবং সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা স্বীকৃতি লাভ করে। ২০ বছরে মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়সূচীর উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। তথাপি বাংলাদেশে এই সংক্রান্ত আইন, নীতি ও কর্মসূচি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানের সাথে পুরোপুরি সমকক্ষ নয়।স্বাধীনতা উত্তর ৪ দশকে বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোর প্রশংসনীয় স্তরে উন্নীত হয়েছে। তবে সরকারী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে দক্ষ সেবাদানকারীর অভাব ও চিকিৎসকের অনুপস্থিতি; উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব; যন্ত্রপাতি ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা ও প্রশাসনের জটিলতা; ঔষধ সরবরাহের অপর্যাপ্ততা ও অপব্যবহার; সুসংগঠিত রেফারেল পদ্ধতি না থাকা যেমন: যথা সময়ে, প্রয়োজনীয় প্রাথমিক ব্যবস্থা না দিয়ে রেফার করা, অপ্রয়োজনীয় রেফার করা; দুর্নীতি এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামোর পূর্ণ সদব্যবহার না হওয়া। এই সকল কারণে মানুষের স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তিতে বিরাট বাধা, যা নারীদের জন্য আরো প্রকট। যা গর্ভবর্তী ও প্রসূতির উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এছাড়া সমাজে নারীর অনগ্রসর অবস্থান, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল স্তরে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী, সামাজিক কুসংস্কার প্রভৃতি কারণে এখনও বছরে ৭-৮ হাজার নারী সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অকালে প্রাণ হারায়।

নারীর অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের যে অঙ্গিকার সংবিধানে লিপিবদ্ধ, তাতে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে ‘নারীর স্বাস্থ্য’ বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচ্য হওয়ার কথা। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ ৪০টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার ভিত্তিক বাজেট অনুশীলন শুরু হলেও, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য সেবার জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ রাখার বিষয়টি এখনও গুরুত্ব পায় নাই। হাসপাতালের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে উপজেলা, জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসমূহে ‘হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করা হলেও সভাপতির অনীহা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে এই কমিটিগুলো সচল ও সক্রিয় হচ্ছে না। উল্লেখ্য এই সকল কমিটির সভাপতি জাতীয় সংসদের মাননীয় সদস্যবৃন্দ।গর্ভকালীণ সেবা ও নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব পরবর্তী সেবা পাওয়া নারীর মৌলিক অধিকারের অংশ, কিন্তু বাংলাদেশের অনেক নারী নিজে ও তার পরিবারে এখনো স্বাস্থ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়।

২০০৯ সালে জাতিসংঘ এর মানবাধিকার কাউন্সিলে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয় , যে প্রসূতি মৃত্যুর অধিক হার ও প্রসবজনিত রোগভোগ অগ্রহণযোগ্য এবং তা প্রতিরোধযোগ্য বলে ঘোষিত হয়। প্রসূতি মৃত্যুর বর্তমান হার জীবনে বেঁচে থাকার অধিকারকে লঙ্ঘন করে; যা নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘনও বটে।গর্ভকালীণ সেবা ও নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব পরবর্তী সেবা পাওয়া নারীর মৌলিক অধিকারের অংশ, কিন্তু বাংলাদেশের অনেক নারী নিজে ও তার পরিবারে এখনো স্বাস্থ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট অধিকারসমূহ:

বেঁচে থাকার অধিকার
স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার
মত প্রকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার
মর্যাদার অধিকার
নিরাপত্তার অধিকার
গৈাপনীয়তার অধিকার
বৈষম্য থেকে মুক্ত থাকার অধিকার
যৌন সহিংসতা থেকে সুরক্ষা পাবার অধিকার
শিক্ষার অধিকার
তথ্য পাওয়ার অধিকার।

বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতিমালা ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু, পুষ্টি, শিশু ও মাতৃমঙ্গল নিশ্চিত করা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, মানসম্মত ওষুধ উৎপাদনে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন প্রভৃতি অঙ্গীকার করে। তথাপি বাংলাদেশে প্রসূতি মৃত্যুর হার এখনও উদ্বেগজনক। সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২২ সালের মধ্যে এই হার বর্তমান ১৯৪ থেকে ১৪৩ এ কমিয়ে আনার অঙ্গিকার ছিল এবং বর্তমানে এই হার ১৭০। বাংলাদেশে প্রসূতি মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমে আসলেও অসচেতনতা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত সেবার অভাবে অনেক নারী প্রসবজনিত জটিলতায় বিভিন্ন রোগ-ভোগে ভূগছে। যা তার পরবর্তী জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলছে।

সমন্বিত যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা তরুণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কল্যাণ ও মর্যাদা নিশ্চিত করে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করে। অধিকার রক্ষা, মূল্যবোধ তৈরি ও ক্ষমতায়নের পথ সুগম করতে সহায়তা করে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ, কর্মসূচি থাকলেও যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনও আমাদের সমাজে সেভাবে দেখা যায় না। যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার বলতে সাধারণভাবে বোঝায় কিশোর-কিশোরীদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা, বয়ঃসন্ধিকালের যত্ন, কিশোর-কিশোরীদের কম বয়সে যৌনতার ক্ষতিকর দিক, শারীরিক পরিবর্তন, পিরিয়ডকালীন জ্ঞান, অনিরাপদ যৌন মিলন, পরিকল্পিত গর্ভধারণ, বিয়ের উপযুক্ত বয়স, নিরাপদ মাতৃত্ব, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি নির্বাচন, স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্কসহ নানা বিষয়ে সঠিকভাবে জানা-বোঝা, আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। কিন্তু বাংলাদেশের পটভূমিতে এসআরএইচআর বিষয়ে সঠিক জ্ঞান অর্জনের চর্চা এখনও সেভাবে তৈরি হয়নি। সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা সম্পর্কে পাঠ্যপুস্তকে থাকলেও শ্রেণিকক্ষে না পড়ানো, মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন ও শিক্ষকদের কাছ থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান না পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষা বিষয়ে ব্যাপক অসচেতনতা রয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারসহ নানা কারণে নারীর প্রতি বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হচ্ছে।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক সমাজের চিত্র

মাত্র ১৫ বছর বয়সে যখন তসলিমার বিয়ে হয়েছিল, তখনও ঋতুকাল সম্পর্কে সে ঠিকমতো জানত না। জানত না এই সময়টায় তার কী করা দরকার, স্বামী সহবাস করা যাবে কি না, তাকে কতটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। শুধু ঋতুকাল কেন, তার দেহের আরও অন্যান্য পরিবর্তন নিয়েও রাবেয়ার কোনো ধারণা ছিল না। এতসব অজানা বিষয় ও ভয় নিয়ে সে যখন স্বামীর সংসারে গিয়েছিল, তখনো কেউ তাকে কিছু জানায়নি। অসহায় রাবেয়ার একমাত্র আশ্রয় ছিল ঘরে বসে চুপিসারে কান্নাকাটি করা।

একই অবস্থা হয়েছিল ১৪ বছর বয়সী নাসিরের। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাসির নিজেকেই যখন চিনতে পারত না, দেহের নানা পরিবর্তন নিয়ে তার মনেই অনেক প্রশ্ন জমা হয়েছিল, তখন সে উত্তর পায়নি সেইসব প্রশ্নের। এরপর নাসির ফুটপাত থেকে একটা যৌন বিষয়ক বই কিনে তার আগ্রহ মেটানোর চেষ্টা করেছিল এবং বলাই বাহুল্য যার ফল ভালো হয়নি।

একইভাবে ময়না যখন ১২ বছর বয়সে তার পরিধেয় বস্ত্রে রক্তের ফোঁটা দেখেছিল, তখন সে ভয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল। ভেবেছিল তার ভয়াবহ কোনো অসুখ করেছে। দৌঁড়ে বাবার কাছে গিয়ে এই ভয়ের কথা বলেছিল। রাবেয়া, নাসির এবং ময়না কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়, তারা আমাদের বন্ধু, ভাই-বোন কিংবা আমরাই। যারা কোনোদিনও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং যৌন জীবন নিয়ে কোনো তথ্য পায়নি তাদের স্কুল, পরিবার বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে। এরকম তথ্য না পাওয়া শিশু-কিশোরের সংখ্যা দেশে অনেক।

বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বয়সে থাকা শিশুরা এমন একটা সমাজ বা গোষ্ঠীর মধ্যে বাস করে, যারা সনাতনি ধ্যানধারণা বিশ্বাস করে ও চর্চা করে। এরা কোনোভাবেই কিশোরদের সঙ্গে যৌন জীবন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো আলোচনাকে গ্রহণ করে না।

অথচ সত্য হলো, একজন শিশু যখন তার বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছে, তখন তার ভেতরে মনো-দৈহিক, সামাজিক এবং আবেগজনিত অনেক প্রশ্ন দেখা দেয় বা সমস্যা তৈরি হয়। এ সময় নিজের দেহ ও মনের এমন সব পরিবর্তন সে লক্ষ করে, যা সম্পর্কে সে জানে না। এই বিষয়গুলো নিয়ে কেউ কখনো তার সঙ্গে আলোচনাও করেনি। তার কোনো ধারণাই নেই জীবনের এই অদ্ভুত পরিবর্তন নিয়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ১০-১৯ বছর পর্যন্ত কৈশোরকাল এবং এটাই বয়ঃসন্ধিকাল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৮ সালের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ১৬ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ২ কোটি ৭৭ লাখ কিশোর-কিশোরী। এ সময়টাতে মানুষের দেহ, মন ও বুদ্ধিবৃত্তিক যে পরিবর্তন ঘটে, তা একেবারেই অচেনা তাদের কাছে। এসব সমস্যা নিয়ে কারো সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। অনেক প্রশ্ন তৈরি হয় শরীর ও মন নিয়ে, কিন্তু উত্তর পাওয়া যায় না।

আইসিডিডিআরবি’র ২০০৫ সালের তথ্যানুযায়ী, বয়ঃসন্ধিকালের শিশুরা বাবা-মা অথবা তাদের শিক্ষকদের সঙ্গে নিরাপদ যৌন জীবন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে তেমন কোনো কথাই বলে না। অন্যদিকে অভিভাবকরাও বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের সচেতন করেন না।

সেই গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এই ঝুঁকিপূর্ণ বয়সে থাকা শিশুরা এমন একটা সমাজ বা গোষ্ঠীর মধ্যে বাস করে, যারা সনাতনি ধ্যানধারণা বিশ্বাস করে ও চর্চা করে। এরা কোনোভাবেই কিশোরদের সঙ্গে যৌন জীবন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো আলোচনাকে গ্রহণ করে না। বরং এই বিষয়ক আলোচনাকে ঘরে-বাইরে, এলাকায়, স্কুলে এখনো ভয়াবহভাবে ঠেকানোর চেষ্টা করা হয়।

প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কতগুলো জরুরি বিষয় জানা দরকার। যেমন— প্রজনন স্বাস্থ্যতত্ত্ব, যৌনতা, পরিবার পরিকল্পনা এবং যৌনবাহিত রোগ। এসব নিয়ে আলোচনা করাটা বাংলাদেশে প্রায় সবধরনের পরিবারে গর্হিত কাজ এবং মনে করা হয় এটা একটা সামাজিক ট্যাবু।

যখন কোনো শিশু-কিশোরের মনে তার ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়, তখন সে তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে নানাভাবে। পাড়া-প্রতিবেশী বা বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বা ইন্টারনেট বা ফেসবুক থেকে পাওয়া তথ্য সবসময় যথেষ্ট হয় না। এখান থেকে পাওয়া তথ্য মাঝেমধ্যে ভুলও হয়। সেক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছানো শিশুরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য পেয়ে থাকে।

এ বয়সীরা খুব আবেগনির্ভর হয়, তারা ঝুঁকি নিতে ভালোবাসে। আবার অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে বলে সবসময় সিদ্ধান্তও নিতে পারে না বা সাহস পায় না। বয়ঃসন্ধিকালের প্রেম, ভালোবাসা, দৈহিক সম্পর্ক, বৈবাহিক জীবন ও দাম্পত্য সম্পর্ক, সন্তান ধারণ এই বয়সীদের খুবই শঙ্কার মধ্যে ফেলে দেয়। এর জের ধরে অনেকেই আত্মহত্যা করে, হতাশায় ভোগে, মনোবৈকল্যের রোগী হয়।

একজন শিশু যখন বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছে, তখন সেই শিশুর দিকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। ছেলেমেয়েরা যদি এই সময়ে বয়ঃসন্ধিকালের জন্য সংবেদনশীল নীতিমালা ও সুবিধাদি পায়, তাহলে তারা নিজেদের জীবন ও যৌবনের ওপর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ আনতে পারবে। নিজেদের মনোদৈহিক পরিবর্তন নিয়ে মনে কোনো প্রশ্ন বা ভুল ধারণা থাকবে না। তারা তাদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং নিজের জীবনের জন্য ক্ষতিকর কোনো পদক্ষেপ নেবে না।

কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা উন্নতকরণের কথা বলা হয়েছে।তবে কাগজে-কলমে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবার কথা যতটা বলা হচ্ছে, বাস্তবে এর প্রয়োগ তেমনটা নয়। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে বাবা-মা, অভিভাবক, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক মতমোড়লদের আমরা এই ইস্যুটি নিয়ে তেমনভাবে সচেতন করতে পারছি না। ফলে সংকট আরও বড় হচ্ছে।

কমিউনিটি ক্লিনিক ও সিকিৎসা সেবা কেমন মাঠ পর্যায়ে চিত্র

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টেকনাফ হাসপাতালের চারদিকে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ফলে অনেকেই এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে চাচ্ছেন না। এগুলো পরিষ্কার করতে হবে। বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তাঁরা চলে যাচ্ছেন যে যার মতো করে। তবে জনবলের অভাবে টেকনাফ প্রতিটি ক্লিনিক হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ অবস্থা বলে স্বীকার করেছেন এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা.এনামুল হক। তিনি জানান, জনবল সংকটের মধ্যেও নানা রোগের চিকিৎসা দিয়ে ৮০ থেকে ৯০ ভাগই সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে আমারা বাজেট ঘোষণা করে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।

টেকনাফ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রম যেভাবে চলছে, তা সত্যিই হতাশাজনক।টেকনাফ উপজেলায় মোট ১৫টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে ৮টি ক্লিনিকের ভবন একেবারে জরাজীর্ণ। হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসকের কোন দেখা পায় না বলে অনেক বার খবর প্রকাশ করা হয়েছে।আর সাবরাং কমিনিউটি ক্লিনিক ভবনের ছাদ দিয়ে পানি পড়ছে। ফলে ভবনগুলো দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ১৫টি ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদায়ক (সিএইচসিপি) নেই। এসব ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহকারীর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। আবার অনেক ক্লিনিকে সিএইচসিপি থাকলেও তাঁরা ঠিক সময়ে আসেন না বা এলেও তাড়াতাড়ি চলে যান। ফলে এলাকার বাসিন্দারা ঠিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না। মনে প্রশ্ন জাগে, একটি উপজেলার এতগুলো কমিউনিটি ক্লিনিকের যদি এ রকম বেহাল পরিস্থিতি বিরাজ করে, তাহলে সে এলাকার সাধারণ মানুষ কী চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে? এসব দেখার কি কেউ নেই?স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীরা রোগীদের মাঝে মধ্যে স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেয় যদি তাদের মন চাই। অনেক সিকিৎসক রোগীদের প্রতি সুন্দর আচরণ করে স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদান করে থাকে।

সিকিৎসকরা রোগীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নিজেদের সুরক্ষার জন্য পিপিই, মাস্ক সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করছে এবং ব্যবহার হচ্ছে নিয়মিত।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে রয়েছে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপ-কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। সরকারিভাবে এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনা মূল্যে ওষুধ সরবরাহ ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য জনবলের সৃষ্ট পদ রয়েছে। কিন্তু জনবল সংকটে গ্রামের সরকারি এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হচ্ছে। সৃজনকৃত পদ আছে কিন্তু জনবল নেই। সৃষ্ট পদের বিপরীতে নেই ডিগ্রিধারী চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল।

চিকিৎসকরা জানান, ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য উপ-কেন্দ্রগুলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবায় ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু নানা সংকটে তা ব্যাহত হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, শুধু টেকনাফে নয়, সারা দেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে একই অবস্থা বিরাজ করছে।এ গুলো নিয়ে আমরা অবগত করছি।

টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন নার্স জানান, কেবল রোগীদের সঙ্গেই নয়, কোনো কোনো চিকিৎসক নার্সদের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেন। কোনো রোগীর জন্য তাঁরা চিকিৎসককে ডাকতে গেলে অনেক চিকিৎসক তাঁদেরও বকাঝকা করেন।বাধ্য হয়ে নিজেরা না গিয়ে অনেক সময় সরাসরি রোগীর
স্বজনদেরকেই চিকিৎসকের কক্ষে পাঠিয়ে দেন নার্সরা। আবার অনেক সময় নার্সরা রোগীদের প্রতি খারাপ আচরণ করে থাকে এ অভিযোগ ও রয়েছে‌। অনেক সিকিৎসক ভালোবাসা দিয়ে সিকিৎসা সেবা প্রদান করে যাচ্ছে নিয়মিত।

এ বিষয়ে জানতে কক্সবাজার জেলা সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের জনবল নিয়োগ দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। হাসপাতালে অপরিষ্কার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের বিষয়ে বার বার তাদের নিয়ে মিটিং করা হয়েছে।

তবে টেকনাফ হাসপাতাল বর্তমান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আছে তবে কিছু ঘাটতি রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কিছু কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থা খারাপ আমি এ বিষয়ে আমি চিঠি লিখেছি। সিকিৎসকের অবহেলা যে রোগীর মারা গেছে সে বিষয়ে আজ ও তদন্ত চলছে। সেন্টমার্টিনে একমাসের মধ্যে আরো তিনজন চিকিৎসক পাঠানো হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
Share on Facebook
Facebook
Tweet about this on Twitter
Twitter
Email this to someone
email
Print this page
Print
Pin on Pinterest
Pinterest

দৈনিক নবচেতনার ইউটিউব চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন