ঢাকা, শুক্রবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সড়কও নেই, সেতুও নেই

রংপুরে সাধারণের চলাচলের জন্য নির্মিত চারটি সেতুতে এখনো হয়নি সংযোগ সড়ক। অথচ এসব সেতু দিয়ে ২০টিরও বেশি গ্রামের মানুষ চলাচল করে। দীর্ঘদিন ধরে সংযোগ সড়ক না থাকা ও ভেঙে পড়া সেতুর সংস্কার না হওয়ায় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। তাই ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন সেতু পারাপার হচ্ছেন তারা।

সংযোগ সড়ক না থাকা সেতু চারটির মধ্যে দুটি মিঠাপুকুর উপজেলায়। একটি রয়েছে পীরগঞ্জে। অপরটি কাউনিয়া উপজেলার মধ্যে। এ ছাড়া তারাগঞ্জে চিকলি নদী পারাপারে দাঁড়িয়ে থাকা বাঁশের সাঁকোটি ভেঙে পড়েছে। তিস্তাবেষ্টিত গঙ্গাচড়ার শংকরদহ ও বিনাবিনাতে বন্যায় দেবে যাওয়া সেতুরও সংস্কার হয়নি।

 

দুর্ভোগ সহনীয় গ্রামবাসীর অভিযোগ, এসব সেতু দিয়ে কষ্ট করে চলাফেরা করা গেলেও পরিবহন নিয়ে যাতায়াত কষ্টকর। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হয় জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে। এতে রোগীর চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া বিড়ম্বনাময় যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে পড়ছে বেশি খরচ। তাদের দাবি, দ্রুত সম্ভব এসব সেতুর সংযোগ সড়ক স্থাপন ও সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করা হোক।

রাস্তা ছাড়া সেতু
মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের খয়বতপুর এলাকায় খালের ওপর নির্মিত হয়েছে একটি নতুন সেতু। ২৯ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত এ সেতু পারাপারে এখনো সম্পন্ন হয়নি সংযোগ সড়ক। সম্প্রতি এই সেতু পারাপারে জনদুর্ভোগ ‘মই দিয়ে পার হতে হয় ২৯ লাখ টাকার সেতু’ শিরোনামে ভিডিওসহ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এর দুদিন পরই সেতুর সংযোগ সড়ক স্থাপনে মাটি ফেলানোর কাজ শুরু হয়। একই উপজেলার ১৭ নং ইমাদপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ সভাপতি মোজাম্মেল হক মিন্টুর বাড়ির পূর্ব পাশে এ রকম আরেকটি সেতু রয়েছে।

 

খয়বতপুরের ওই সেতুটির ১০০ গজের মধ্যে রয়েছে এইচ আর (হাজেরা-রাজ্জাক) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেতুর উত্তর দিকে বসতবাড়ি ও পুকুর রয়েছে। সেখানে কীভাবে সংযোগ সড়ক হবে, তা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন। এই সেতু ধরে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও শতাধিক পরিবারের লোকজন চলাচল করে। তাদেরই একজন স্থানীয় আশরাফ আলী। পেশায় চাকরিজীবী। তিনি বলেন, আমার বাড়ির সামনেই এই সেতুটা। দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ হচ্ছে। এখনো কষ্ট করে যাতায়াত করতে হয়। কিছুদিন আগে সংযোগ সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু একদিকে রাস্তা থাকলেও আরেক দিকে রাস্তা নেই।

 

ভাঙা সেতুর সংযোগে কাঠের সাঁকো
কাউনিয়া উপজেলায় টেপামধুপুর ইউনিয়নের আজমখাঁ গ্রাম। সেখানে মানস নদীর ওপর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এডিপি প্রকল্পের অর্থায়নে একটি সেতু নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় ১০ লাখ টাকা। কিন্তু ২০১৭ সালের বন্যায় এই সেতুর পশ্চিমাংশ পানিতে ধসে পড়ে। বর্তমানে সেতুটির পশ্চিমাংশের পুরোটা দেবে গিয়ে নদীতে তলিয়ে আছে। সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়কও ভেঙে গেছে। স্থানীয়রা সেই সেতুর সঙ্গে সংযোগ সড়ক না থাকায় কাঠের সাঁকো গড়েছেন। চার বছর ধরে ঝুঁকি নিয়ে পাঁচ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ সেতু পারাপার হচ্ছে।

দুর্ভোগের কথা জানতে চাইলে আক্ষেপ নিয়ে আজমখাঁ গ্রামের কৃষক মমদেল মিয়া বলেন, একসময় নদীতে সেতু ছিল না। তখন নৌকা ছিল। নৌকায় করে আমরা পারাপার হতাম। কিন্তু সেতুর তৈরির কয়েক বছর না যেতেই ভেঙে পড়ে। এখন পর্যন্ত আর কোনো কাজ করা হয়নি। এখন সেতু থাকলেও সাঁকোই ভরসা।

 

ওই সেতু দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন পার্শ্ববর্তী হয়বৎখাঁর গ্রামের সবুর আলী। ষাটোর্ধ্ব এই বৃদ্ধ বলেন, এই সেতু ছাড়া হাটবাজার টাউন যাবার জনতে আলাদা কোনো ঘাটা (রাস্তা) নাই। মনোত ভয় থাকলেও কষ্ট করি হাঁটাচলা করা লাগে। অসুস্থ রোগীক নিয়্যা হাসপাতালোত যাইতে বেশি সমস্যা হয়। নড়বড়ে সাঁকোত মোটরসাইকেল, সাইকেল নিয়্যা চলাচল আরও মুশকিল। হামার জনতে এটে একটা নয়া সেতু তৈরি করা খুব দরকার, বাহে।

ফাঁকা মাঠে এতিম সেতু
দুই দিকে ফসলি জমি। মাঝখানে সরু খাল। তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে এ সেতুটি। এর দুপাশে চলাচলে সংযোগ সড়ক না থাকায় কোনো কাজেই আসছে না সেতুটি। এ কারণে স্থানীয়দের কাছে এটি এখন পরিচিত সংযোগ সড়কবিহীন ‘এতিম সেতু’ হিসেবে। পীরগঞ্জ উপজেলার ভেন্ডাবাড়ী গ্রামের সোনামতি শাখা খালের ওপর এতিম এ সেতুর গোড়াপত্তন। উত্তরে ফসলি জমির পাশ দিয়ে সরু রাস্তা থাকলেও সেখানে এখনো মাটি পড়েনি। আর দক্ষিণে সড়কের বদলে দেখা মিলবে শুধুই ফসলি জমি। চলতি বছরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এই সেতুটি নির্মাণ করেছে। যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৩ হাজার ৯১ টাকা।

ওই গ্রামের কৃষক আব্দুল মতিন বলেন, মাঠে যেতে বা ফসল বাড়িতে নেওয়ার জন্য একটি তিন ফুট প্রস্থের মাটির রাস্তা রয়েছে। সবাই ওই রাস্তা ধরেই যাতায়াত করে। এখন খালের ওপর একটি সেতু হয়েছে। কিন্তু রাস্তা ছাড়া উঁচু সেতুতে তো ওঠানামা করা যাবে না। ওইখানে এই সেতুর দরকারও নেই। অহেতুক সরকারের লাখ লাখ টাকা নষ্ট করা হচ্ছে।

 

সংযোগ সড়ক ছাড়া সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভেন্ডাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, স্থানীয় কৃষকেরা মাঠ থেকে ফসল কেটে কষ্ট করে বাড়িতে নিয়ে যান। তাদের কষ্ট লাঘবের জন্য খালের ওপর সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। এ জন্য কৃষকদের সঙ্গে একটি চুক্তিও করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুমের কারণে সেতুর গোড়ায় মাটি দেওয়া হয়নি। তবে সেতুর দুপাশে মাটি ভরাট হলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন।

শাইলবাড়ির মরা সাঁকো
তারাগঞ্জ উপজেলা থেকে সাত কিলোমিটার ভেতরে শাইলবাড়ি গ্রাম। পাশেই রয়েছে চিকলী নদী। এ নদীঘেঁষা খেয়াঘাট পারাপারের নেই কোনো সেতু। বর্ষা-খরা মৌসুমে কষ্ট করেই নদী পারাপার হতো ১২টি গ্রামের অন্তত ১০ হাজার মানুষ। একটা সেতুর জন্য দীর্ঘদিন ধরে কেঁদেছেন সেখানকার বাসিন্দরা। কিন্তু কোথাও থেকে সাড়া মেলেনি। বাধ্য হয়ে চাঁদা তুলে নদীর পেটে বাঁশের সাঁকো দাঁড় করান স্থানীয়রা। ঝুঁকিপূর্ণ সেই সাঁকোই ছিল চলাচলের শেষ ভরসা।

সম্প্রতি বাঁশের সেই মরা সাঁকো ভরাজলের তোড়ে ভেসে গেছে। এতে আবারও শাইলবাড়ি, দর্জিপাড়া, খ্যানপাড়, ডাঙ্গাপাড়া, মহেশখোলা, নলুয়ারডাঙ্গা, প্রামাণিকপাড়া, কোরানীপাড়া, ভীমপুর, মৌলভীপাড়া, বানিয়াপাড়াসহ ১২টি গ্রামের ১০ হাজার মানুষ যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এখন উপজেলা শহরে যাতায়াত করতে হচ্ছে অতিরিক্ত চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে।

শাইলবাড়ি এলাকার কলেজপড়ুয়া ইকরামুল হক বলেন, সাঁকো দিয়েই পার হয়ে আমাদের এলাকার ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতাম। এখন সাঁকো ভেঙে যাওয়ায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা বেশি যাওয়া লাগবে। হাজারো মানুষ প্রতিদিন এই বাঁশের সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করত। শুকনো মৌসুমে নদীর হাঁটুপানি পার হয়ে যাতায়াত সম্ভব। কিন্তু এখন তো চারদিকে পানি। এ কারণে সবাইকে এখন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। আমরা চাই এখানে একটা স্থায়ী সেতু নির্মিত হোক।

 

এ ছাড়া গঙ্গাচড়ার তিস্তা অববাহিকায় গেল কয়েক বছরের বন্যায় কয়েকটি সেতু নদীগর্ভে বিলীন হলেও এখন পর্যন্ত বিকল্প কোনো সেতু তৈরি করা হয়নি। চরাঞ্চলে প্রতিবছরই বন্যার সময়ে নদীভাঙনে যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেখানকার বিনবিনা, শংকরদহ, বাঘডহরার বিভিন্ন সময়ে বন্যায় দেবে যাওয়া সেতুগুলোর সংস্কার হয়নি। কোথাও কোথাও আজও সংযোগ সড়ক না থাকায় বাঁশ-কাঠের সাঁকো দিয়েই চলাচল করছে মানুষজন।

সেতুর তথ্য দিতে গড়িমসি
রংপুরের আট উপজেলায় কতগুলো সেতু রয়েছে, এই পরিসংখ্যান জানতে কয়েকবার কয়েক দিন কালক্ষেপণ করেও তথ্য পাওয়া যায়নি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের আওতাধীন সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জানা নেই ক্ষতিগ্রস্ত সেতুর সঠিক সংখ্যা। তবে গেল তিন অর্থবছরে জেলায় ১০৮টি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে বলে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ টি এম আখতারুজ্জামান নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের গ্রামীণ রাস্তায় সেতু-কালভার্ট নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় আট উপজেলাতে একই প্রকল্পে তিন বছরে ১০৮টি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সেতু হয়েছে মিঠাপুকুরে। এ উপজেলায় ২৫টি নির্মাণ হয়েছে।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৮টি সেতু হয়েছে পীরগঞ্জে। উপজেলা হিসেবে সবচেয়ে কম ৭টি সেতু রয়েছে কাউনিয়াতে। এ ছাড়া গঙ্গাচড়া উপজেলাতে ১৫, বদরগঞ্জে ১৫, পীরগাছাতে ১১, রংপুর সদরে ৯ এবং তারাগঞ্জে আটটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে।